
মুরুগুমা থেকে উশুলডুংরি: লাল মাটির পথে হারিয়ে যাওয়া শৈশব আর বন্ধুত্বের গল্প।
বিভাস শান্তনু সুজয় শুভাশিস বিশ্বজিৎ বিশ্বরূপ শঙ্খশুভ্র নবারুণ রঞ্জন কালাদা সৌরভ উত্তম এ কোন গল্প নয়, না এ কোন ভ্রমণকাহিনি। এ এক আধার, যেখানে পথচলার ক্লান্তির ফাঁকে শেষ যৌবন হাত বাড়িয়ে ছুঁয়ে দেখে নিজেরই ছেলেবেলাকে, যে ছেলেবেলা কোন মানচিত্র মানত না, কেবল বিশ্বাস রাখত উষ্ণতায়। এ আধারে গল্প নেই, ভ্রমণও নেই। এ এক ফাঁকা জায়গা যেখানে বড় হয়ে ওঠার শেষ প্রান্তে হঠাৎ উঁকি দিয়ে যায় সেই ছোট হয়ে থাকার স্মৃতি। যেখানে খুঁজে পাওয়া যায় ভাল থাকার একান্ত নিজস্ব চিরকুট। ৪ঠা ডিসেম্বর, সকাল সাতটা। এখন গাড়িতে। রাসবিহারি মোড়ে সকলের জমায়েত হতে আধঘণ্টা লেগেছে। ফলে সাড়ে ছ’টার বদলে গাড়ি ছাড়ল এখন। দুটো SUV গাড়িতে যাতায়াতের ব্যবস্থা হয়েছে। চার জন করে এক একটা গাড়িতে। একটি গাড়ির সারথি কালাদা এবং অপরটির সৌরভ। হালকা শীতের সকালে মৃদু রোদের তাপ মেখে উঠে পড়া গেছে গাড়িতে। অনেক চড়াই উৎরাই পেরিয়ে অবশেষে রওয়ানা হওয়া গেল পুরুলিয়ার পথে। অনেক দিনের সলতে পাকানো পর্ব আপাতত শেষ। এখন দেখা যাক আগামী দিনগুলো কিরকম কাটে। কি কি অপেক্ষা করে আছে আমাদের জন্য। বাহন প্রস্তুত কি খুশি কত চাপ নিয়ে বেরোতে হয়েছে। প্রায় ফাঁকা রাস্তায় গাড়ির গতি বেশ ভালোই। পুরুলিয়া যাবার প্রস্তাব প্রথম আসে বিদেশী বন্ধুদের কাছ থেকে। পরের ঠান্ডায় ‘কয়েকজন মিলে কোথাও ঘুরে আসলে কেমন হয়’ টাইপের কথা দিয়ে শুরু। তারপর অবিশ্যি কয়েকজন এব্যাপারে উৎসাহ দেখালেও শেষ পর্যন্ত সেটা ঠান্ডা ঘরে যেতে বসেছিল। কিন্তু সে প্রস্তাবে আবার অক্সিজেন জোগালেন ডাক্তারবাবু। এক প্যাচপ্যাচে ঘর্মাক্ত গ্রীষ্মের দুপুরে, মোড়লের বাড়ির সিঁড়ির শেষ ধাপে দাঁড়িয়ে তিনি ফিসফিস করে আমায় জানালেন, পুরুলিয়া ট্যুর কিন্তু হবে। নীলাঞ্জন, দেবাশিস, অনলের পক্ষে যাওয়া সম্ভব না হলেও আমরা কিন্তু যাব। কেউ না গেলেও আমি তুই আর মোড়ল যাব। সহযাত্রীদের মধ্যে রয়েছেন স্বনামধন্য ডাক্তারবাবু শঙ্খ শুভ্র দাস। যিনি সম্প্রতি মহামানব উপাধি প্রাপ্ত হয়েছেন। আজকাল তিনি সর্বদাই আবেগের বেগে বেগবান। কবিতা টবিতার মাধ্যমে ভাব ভালবাসা বিলোন। আছেন প্রাতঃস্মরণীয় শান্তনু গুহ যিনি শিশুকালেই মোড়ল উপাধিতে ভূষিত হয়েছিলেন। ইদানিং IBS নামক ঘ্যানঘ্যানে হতচ্ছাড়া পেটের ব্যারামটার জন্য যাঁর মেজাজ ও মোড়লগিরি দুটোই সপ্তমে চড়ে থাকে। পলিটিক্যাল আলোচনা ইনি ইঅ্যাকদম পছন্দ করেন না। সুজয় ঘোষ। বাল্যকালে বেঁটে ও বুড়ো বয়সে লম্বা হয়ে যাওয়া মানুষটি প্রস্তাব পেয়েই সানন্দে রাজি হয়েছেন যেতে এবং যাঁরা যাবার ব্যাপারে এক্কা দোক্কা খেলছিলেন তাঁদের প্রতি মোলায়েম অপভাষা প্রয়োগ করার ব্যাপারে বিশেষ যত্নবান ছিলেন। সাথে আপাতত নেই কিন্তু পরে যোগ দেবেন বিভাস রায়। আড্ডায় উনি ঘ্যামা ঘ্যামা বিষয় উত্থাপন করবেন এবং গুছিয়ে ভাষণ দেবেন এহেন ইঙ্গিত খোলাখুলি দিয়ে রেখেছেন। প্রস্তুতির জন্য ওনার বাড়তি একদিন লাগবে তাই উনি পরেরদিন আসছেন। ছোটবেলা ফিরে পাবার তীব্র আকাঙ্খা নিয়ে ছোটবেলার বন্ধুদের সব ইভেন্টে দৌড়ে যাওয়া, শুভাশিস চন্দ্র, এবারও আমাদের সফরসঙ্গী। ‘এরকম সুযোগ আর আসবে না, সেই ছোটবেলায় ফিরে যাবার, তত্বের প্রণেতা গম্ভীর মুখে আপাতত ছোটবেলায় ফেরার পথ ধরেছেন। পাশে ঢুলছেন বিশ্বজিৎ চক্রবর্তী। কিঞ্চিৎ অসুস্থ। শরীরে ও মনে। সেই বাল্যকাল থেকে বডি শেমিংয়ের শিকার। আরো কত কিছুর শিকার। তবুও কোন হা হুতাশ নেই। যদিও এখন তিনি রোগা হচ্ছেন। একটু চনমনে হলেই আমরা তার থেকে আবার সেই স্কুলে আসার পথে ট্রামের ওভারটেকের কারণে দেরি হয়ে যাবার করুন কাহিনী শুনবো, নিশ্চিত। পাশে কঠিন মুখ করে বসে গুন্ডা। আরেক বাল্যকালেই উপাধিপ্রাপ্ত মহাপুরুষ। বিশ্বরূপ। সারাক্ষণ টুপি পরে বসে থাকার কারণে টাক চুলকানোর রহস্যটা এখনো অধরা। যেমন অধরা মোড়ল তাকে লাস্ট ডাউন ব্যাট দিত কেন, সেই রহস্যটাও। নবারুণ হালদার। হালদার বংশের উজ্জ্বল রত্নটি জীবন বিমা নিগমের টন টন কাজের বোঝা কাঁধে নিয়ে আমাদের সাথে সামিল হয়েছেন। গাড়িতে বসেই আপিস সংক্রান্ত কাজ কর্ম চালিয়ে যাবেন তেমন সম্ভাবনা প্রবল। আর লাস্ট যে কাট পিস পড়ে রইল সেটা আমি। এ যাত্রার আগা থেকে গোড়া পর্যন্ত পুরোটাই জুড়ে রইলাম। চুপিচুপি বলে রাখি, আপনি আমাকে যা ভাবেন, আমি ঠিক তাই। হ্যাঁ, আমাকে বা আমার ব্যাপারে যেটা মনে করেন, বিশ্বাস করেন, আমি ঠিক সেটাই। আপনারা পৌঁইপের নাম শুনেছেন কি? প্রদীপ ভটচাজ দ্য গ্রেট। না, তিনি নেই আমাদের সাথে। যাঁকে দলে ভেড়ানোর জন্য প্রায় আন্তর্জাতিক স্তর পর্যন্ত অনুরোধের ঢেঁকি বইতে হয়েছিল। তাও উনি কেন যেতে রাজি হলেন না, জানা নেই। ওসব হাই লেভেলের ব্যাপার জানতেও নেই। অজানা থাকাই ভাল। কাঁচা রোদ ভেদ করে, পিচ মাড়িয়ে আমাদের গাড়ি ছুটে চলেছে বেশ গতিতে। কলকাতা পিছনে ফেলে এসেছি বেশ কিছুক্ষণ। হাইওয়ের দু’পাশে যেরকম দৃশ্য থাকে সাধারণত, ঠিক সেরকমই দৃশ্য দেখছি জানলার কাঁচ দিয়ে। যাওয়া আসার চার চার করে আট গলির রাস্তা। দু’পাশের ইস্পাতের বেড়ার ওধারে মাঠঘাট। শহরতলীর শান্ত জীবন। সবুজের সমারোহ। গাড়ির ভিতরে হৈ হুল্লোড়ের মধ্যেও অনেকক্ষণ ধরে উশখুশ করতে থাকা বিশ্বরূপ করুণ মুখ করে কিছু একটা বিড়বিড় করছিল। নজর না করলে বোঝাও যেত না। প্রার্থনা ট্রার্থনা হবে হয়তো। সংস্কৃত না বাংলায় প্রার্থনা করছে বোঝার আশায় ওর মুখের কাছে কান নিয়ে গিয়ে শোনা গেলো, ‘ব্রেকফাস্ট কখন? খিদে পেয়েছে হেবি।’ দুটো গাড়ি হাইওয়ে ছেড়ে ইউ টার্ন নিয়ে সার্ভিস রোডের দিকে ঘুরে গেল। সামনে এক্সপ্রেস ধাবা। আমরা কোলাঘাটে এসে পৌঁছেছি। এক্সপ্রেস ধাবা, কোলাঘাট সঞ্চাল সঞ্চাল পেট পুজো একসাথে থাকলে প্রতিটি মুহূর্তই স্পেশাল ৪ঠা ডিসেম্বর, সকাল দশটা। কিছুক্ষণ হল গাড়ি ছেড়েছে। রেস্তোরাঁয় জমিয়ে ব্রেকফাস্ট ও ওয়াশরুম পর্ব সারার পর সবার মুড বেশ ঝরঝরে। পেটে গজগজ করছে আলু পরোটা, ধোসা আর চা। যে যার নিজের খুশি মত খেয়েছে। গাড়ি চলেছে বম্বে রোড ধরে খড়ঙ্গপুরের দিকে। আমাদের সামনের সিটে দুজন চালক। কালাদা স্টিয়ারিং হাতে আর শঙ্খ মুখে গাড়ি চালাচ্ছে। শঙ্খ বলছে বাঁদিকে, কালাদা স্টিয়ারিং ঘোরাচ্ছে বাঁদিকে। শঙ্খ ডানদিকে বললে গাড়ি ডানদিকে যাচ্ছে। আসতে বললে গাড়ির গতি কমছে। জোরে বললে কালাদা অ্যাক্সেলারেটরে চাপ দিচ্ছে। দুপক্ষের সমঝোতা আসাধারন। শঙ্খ যা বলছে, কালাদা তাই করছে। শঙ্খর ফোন এলে কালাদা গাড়ি স্লো করে শঙ্খর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে, পরবর্তী নির্দেশের অপেক্ষায়। পিছনে গাড়ির হর্ন, সামনে ফাঁকা রাস্তা যাই থাক না কেন, গাড়ির গতি বা দিক পরিবর্তন শঙ্খর নির্দেশ সাপেক্ষ। ষাট স্পিডে চলছে গাড়ি, সামনে বাষ্প। শঙ্খ ফোনে ব্যস্ত। পেশেন্ট উঠে বসেছে, ডিসচার্জ হচ্ছে। কালাদা কোন নির্দেশ না পেয়ে ওই গতিতে পেরিয়ে গেল বাম্প। আমরা গাড়ির মধ্যে উঠলাম এবং নামলাম। মাথায় হাত বুলোতে বুলোতে দেখলাম খঙ্গপুর পেরিয়ে ঝাড়গ্রামের পথে চলেছি। ৪ঠা ডিসেম্বর, দুপুর আড়াইটে। বাঁকুড়ার ঝিলিমিলি, পাইস হোটেল মনোরঞ্জনের সামনে দাঁড়িয়ে আমরা। কেউ কেউ খড়কে কাঠি দিয়ে দাঁত খুঁচোচ্ছে। বেড়ে খাওয়া দাওয়া হয়েছে সবার। ঝাড়গ্রাম, লোধাশুলি, বেলপাহাড়ি হয়ে অনেকটা পথ চলে এখানে এসেছি। দুপুরের রোদের উষ্ণতায় ঠাণ্ডা এখনো তেমন কিছু মালুম হচ্ছে না। বেলা বাড়ার সাথে সাথে খিদে চাগাড় দিয়েছিল সবার। গরম গরম ভাত, ডাল, ভাজা, তরকারি, মাছ, মাংস যার যা খুশি পেট পুরে খেয়েছে। পথে সেরকম উল্লেখযোগ্য কিছু ঘটেনি। কালাদা ডানদিক, বাঁদিক, জোরে, আসতে সব নির্দেশ ঠিকঠাক মেনে চালিয়েছেন। অন্য গাড়ির চালক হিরো হিরো টাইপ সৌরভ আমাদের একটু আগেই বাকি চারজনকে নিয়ে হাজির
































