এ কোন গল্প নয়, না এ কোন ভ্রমণকাহিনি। এ এক আধার, যেখানে পথচলার ক্লান্তির ফাঁকে শেষ যৌবন হাত বাড়িয়ে ছুঁয়ে দেখে নিজেরই ছেলেবেলাকে, যে ছেলেবেলা কোন মানচিত্র মানত না, কেবল বিশ্বাস রাখত উষ্ণতায়। এ আধারে গল্প নেই, ভ্রমণও নেই। এ এক ফাঁকা জায়গা যেখানে বড় হয়ে ওঠার শেষ প্রান্তে হঠাৎ উঁকি দিয়ে যায় সেই ছোট হয়ে থাকার স্মৃতি। যেখানে খুঁজে পাওয়া যায় ভাল থাকার একান্ত নিজস্ব চিরকুট।
৪ঠা ডিসেম্বর, সকাল সাতটা।
এখন গাড়িতে। রাসবিহারি মোড়ে সকলের জমায়েত হতে আধঘণ্টা লেগেছে। ফলে সাড়ে ছ’টার বদলে গাড়ি ছাড়ল এখন। দুটো SUV গাড়িতে যাতায়াতের ব্যবস্থা হয়েছে। চার জন করে এক একটা গাড়িতে। একটি গাড়ির সারথি কালাদা এবং অপরটির সৌরভ। হালকা শীতের সকালে মৃদু রোদের তাপ মেখে উঠে পড়া গেছে গাড়িতে। অনেক চড়াই উৎরাই পেরিয়ে অবশেষে রওয়ানা হওয়া গেল পুরুলিয়ার পথে। অনেক দিনের সলতে পাকানো পর্ব আপাতত শেষ। এখন দেখা যাক আগামী দিনগুলো কিরকম কাটে। কি কি অপেক্ষা করে আছে আমাদের জন্য।

বিভাস

শান্তনু

সুজয়

শুভাশিস

বিশ্বজিৎ

বিশ্বরূপ

শঙ্খশুভ্র

নবারুণ

রঞ্জন

কালাদা

সৌরভ

উত্তম
প্রায় ফাঁকা রাস্তায় গাড়ির গতি বেশ ভালোই। পুরুলিয়া যাবার প্রস্তাব প্রথম আসে বিদেশী বন্ধুদের কাছ থেকে। পরের ঠান্ডায় ‘কয়েকজন মিলে কোথাও ঘুরে আসলে কেমন হয়’ টাইপের কথা দিয়ে শুরু। তারপর অবিশ্যি কয়েকজন এব্যাপারে উৎসাহ দেখালেও শেষ পর্যন্ত সেটা ঠান্ডা ঘরে যেতে বসেছিল। কিন্তু সে প্রস্তাবে আবার অক্সিজেন জোগালেন ডাক্তারবাবু। এক প্যাচপ্যাচে ঘর্মাক্ত গ্রীষ্মের দুপুরে, মোড়লের বাড়ির সিঁড়ির শেষ ধাপে দাঁড়িয়ে তিনি ফিসফিস করে আমায় জানালেন, পুরুলিয়া ট্যুর কিন্তু হবে। নীলাঞ্জন, দেবাশিস, অনলের পক্ষে যাওয়া সম্ভব না হলেও আমরা কিন্তু যাব। কেউ না গেলেও আমি তুই আর মোড়ল যাব।
সহযাত্রীদের মধ্যে রয়েছেন স্বনামধন্য ডাক্তারবাবু শঙ্খ শুভ্র দাস। যিনি সম্প্রতি মহামানব উপাধি প্রাপ্ত হয়েছেন। আজকাল তিনি সর্বদাই আবেগের বেগে বেগবান। কবিতা টবিতার মাধ্যমে ভাব ভালবাসা বিলোন।
আছেন প্রাতঃস্মরণীয় শান্তনু গুহ যিনি শিশুকালেই মোড়ল উপাধিতে ভূষিত হয়েছিলেন। ইদানিং IBS নামক ঘ্যানঘ্যানে হতচ্ছাড়া পেটের ব্যারামটার জন্য যাঁর মেজাজ ও মোড়লগিরি দুটোই সপ্তমে চড়ে থাকে। পলিটিক্যাল আলোচনা ইনি ইঅ্যাকদম পছন্দ করেন না।
সুজয় ঘোষ। বাল্যকালে বেঁটে ও বুড়ো বয়সে লম্বা হয়ে যাওয়া মানুষটি প্রস্তাব পেয়েই সানন্দে রাজি হয়েছেন যেতে এবং যাঁরা যাবার ব্যাপারে এক্কা দোক্কা খেলছিলেন তাঁদের প্রতি মোলায়েম অপভাষা প্রয়োগ করার ব্যাপারে বিশেষ যত্নবান ছিলেন।
সাথে আপাতত নেই কিন্তু পরে যোগ দেবেন বিভাস রায়। আড্ডায় উনি ঘ্যামা ঘ্যামা বিষয় উত্থাপন করবেন এবং গুছিয়ে ভাষণ দেবেন এহেন ইঙ্গিত খোলাখুলি দিয়ে রেখেছেন। প্রস্তুতির জন্য ওনার বাড়তি একদিন লাগবে তাই উনি পরেরদিন আসছেন।
ছোটবেলা ফিরে পাবার তীব্র আকাঙ্খা নিয়ে ছোটবেলার বন্ধুদের সব ইভেন্টে দৌড়ে যাওয়া, শুভাশিস চন্দ্র, এবারও আমাদের সফরসঙ্গী। ‘এরকম সুযোগ আর আসবে না, সেই ছোটবেলায় ফিরে যাবার, তত্বের প্রণেতা গম্ভীর মুখে আপাতত ছোটবেলায় ফেরার পথ ধরেছেন।
পাশে ঢুলছেন বিশ্বজিৎ চক্রবর্তী। কিঞ্চিৎ অসুস্থ। শরীরে ও মনে। সেই বাল্যকাল থেকে বডি শেমিংয়ের শিকার। আরো কত কিছুর শিকার। তবুও কোন হা হুতাশ নেই। যদিও এখন তিনি রোগা হচ্ছেন। একটু চনমনে হলেই আমরা তার থেকে আবার সেই স্কুলে আসার পথে ট্রামের ওভারটেকের কারণে দেরি হয়ে যাবার করুন কাহিনী শুনবো, নিশ্চিত।
পাশে কঠিন মুখ করে বসে গুন্ডা। আরেক বাল্যকালেই উপাধিপ্রাপ্ত মহাপুরুষ। বিশ্বরূপ। সারাক্ষণ টুপি পরে বসে থাকার কারণে টাক চুলকানোর রহস্যটা এখনো অধরা। যেমন অধরা মোড়ল তাকে লাস্ট ডাউন ব্যাট দিত কেন, সেই রহস্যটাও।
নবারুণ হালদার। হালদার বংশের উজ্জ্বল রত্নটি জীবন বিমা নিগমের টন টন কাজের বোঝা কাঁধে নিয়ে আমাদের সাথে সামিল হয়েছেন। গাড়িতে বসেই আপিস সংক্রান্ত কাজ কর্ম চালিয়ে যাবেন তেমন সম্ভাবনা প্রবল।
আর লাস্ট যে কাট পিস পড়ে রইল সেটা আমি। এ যাত্রার আগা থেকে গোড়া পর্যন্ত পুরোটাই জুড়ে রইলাম। চুপিচুপি বলে রাখি, আপনি আমাকে যা ভাবেন, আমি ঠিক তাই। হ্যাঁ, আমাকে বা আমার ব্যাপারে যেটা মনে করেন, বিশ্বাস করেন, আমি ঠিক সেটাই।
আপনারা পৌঁইপের নাম শুনেছেন কি? প্রদীপ ভটচাজ দ্য গ্রেট। না, তিনি নেই আমাদের সাথে। যাঁকে দলে ভেড়ানোর জন্য প্রায় আন্তর্জাতিক স্তর পর্যন্ত অনুরোধের ঢেঁকি বইতে হয়েছিল। তাও উনি কেন যেতে রাজি হলেন না, জানা নেই। ওসব হাই লেভেলের ব্যাপার জানতেও নেই। অজানা থাকাই ভাল।
কাঁচা রোদ ভেদ করে, পিচ মাড়িয়ে আমাদের গাড়ি ছুটে চলেছে বেশ গতিতে। কলকাতা পিছনে ফেলে এসেছি বেশ কিছুক্ষণ। হাইওয়ের দু’পাশে যেরকম দৃশ্য থাকে সাধারণত, ঠিক সেরকমই দৃশ্য দেখছি জানলার কাঁচ দিয়ে। যাওয়া আসার চার চার করে আট গলির রাস্তা। দু’পাশের ইস্পাতের বেড়ার ওধারে মাঠঘাট। শহরতলীর শান্ত জীবন। সবুজের সমারোহ। গাড়ির ভিতরে হৈ হুল্লোড়ের মধ্যেও অনেকক্ষণ ধরে উশখুশ করতে থাকা বিশ্বরূপ করুণ মুখ করে কিছু একটা বিড়বিড় করছিল। নজর না করলে বোঝাও যেত না। প্রার্থনা ট্রার্থনা হবে হয়তো। সংস্কৃত না বাংলায় প্রার্থনা করছে বোঝার আশায় ওর মুখের কাছে কান নিয়ে গিয়ে শোনা গেলো, ‘ব্রেকফাস্ট কখন? খিদে পেয়েছে হেবি।’
দুটো গাড়ি হাইওয়ে ছেড়ে ইউ টার্ন নিয়ে সার্ভিস রোডের দিকে ঘুরে গেল। সামনে এক্সপ্রেস ধাবা। আমরা কোলাঘাটে এসে পৌঁছেছি।
৪ঠা ডিসেম্বর, সকাল দশটা।
কিছুক্ষণ হল গাড়ি ছেড়েছে। রেস্তোরাঁয় জমিয়ে ব্রেকফাস্ট ও ওয়াশরুম পর্ব সারার পর সবার মুড বেশ ঝরঝরে। পেটে গজগজ করছে আলু পরোটা, ধোসা আর চা। যে যার নিজের খুশি মত খেয়েছে। গাড়ি চলেছে বম্বে রোড ধরে খড়ঙ্গপুরের দিকে। আমাদের সামনের সিটে দুজন চালক। কালাদা স্টিয়ারিং হাতে আর শঙ্খ মুখে গাড়ি চালাচ্ছে। শঙ্খ বলছে বাঁদিকে, কালাদা স্টিয়ারিং ঘোরাচ্ছে বাঁদিকে। শঙ্খ ডানদিকে বললে গাড়ি ডানদিকে যাচ্ছে। আসতে বললে গাড়ির গতি কমছে। জোরে বললে কালাদা অ্যাক্সেলারেটরে চাপ দিচ্ছে। দুপক্ষের সমঝোতা আসাধারন। শঙ্খ যা বলছে, কালাদা তাই করছে। শঙ্খর ফোন এলে কালাদা গাড়ি স্লো করে শঙ্খর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে, পরবর্তী নির্দেশের অপেক্ষায়। পিছনে গাড়ির হর্ন, সামনে ফাঁকা রাস্তা যাই থাক না কেন, গাড়ির গতি বা দিক পরিবর্তন শঙ্খর নির্দেশ সাপেক্ষ। ষাট স্পিডে চলছে গাড়ি, সামনে বাষ্প। শঙ্খ ফোনে ব্যস্ত। পেশেন্ট উঠে বসেছে, ডিসচার্জ হচ্ছে। কালাদা কোন নির্দেশ না পেয়ে ওই গতিতে পেরিয়ে গেল বাম্প।
আমরা গাড়ির মধ্যে উঠলাম এবং নামলাম। মাথায় হাত বুলোতে বুলোতে দেখলাম খঙ্গপুর পেরিয়ে ঝাড়গ্রামের পথে চলেছি।
৪ঠা ডিসেম্বর, দুপুর আড়াইটে।
বাঁকুড়ার ঝিলিমিলি, পাইস হোটেল মনোরঞ্জনের সামনে দাঁড়িয়ে আমরা। কেউ কেউ খড়কে কাঠি দিয়ে দাঁত খুঁচোচ্ছে। বেড়ে খাওয়া দাওয়া হয়েছে সবার। ঝাড়গ্রাম, লোধাশুলি, বেলপাহাড়ি হয়ে অনেকটা পথ চলে এখানে এসেছি। দুপুরের রোদের উষ্ণতায় ঠাণ্ডা এখনো তেমন কিছু মালুম হচ্ছে না। বেলা বাড়ার সাথে সাথে খিদে চাগাড় দিয়েছিল সবার। গরম গরম ভাত, ডাল, ভাজা, তরকারি, মাছ, মাংস যার যা খুশি পেট পুরে খেয়েছে। পথে সেরকম উল্লেখযোগ্য কিছু ঘটেনি। কালাদা ডানদিক, বাঁদিক, জোরে, আসতে সব নির্দেশ ঠিকঠাক মেনে চালিয়েছেন। অন্য গাড়ির চালক হিরো হিরো টাইপ সৌরভ আমাদের একটু আগেই বাকি চারজনকে নিয়ে হাজির করেছিলেন এখানে। বিশ্বরূপ অবিশ্যি লোধাগুলি থেকেই উশখুশ আর বিড়বিড় করা শুরু করেছিল। পূর্ব অভিজ্ঞতা হেতু এবার আর প্রার্থনা ভেবে কানটা ওর মুখের কাছে নিয়ে যাইনি।
৪ঠা ডিসেম্বর, সন্ধ্যা ছ’টা।
কিছুক্ষণ আগেই আমরা এসে পৌঁছেছি মুরুগুমা। এটি পুরুলিয়া শহর থেকে প্রায় ৫৫ কিলোমিটার দূরে, অযোধ্যা পাহাড়ের পাদদেশে, ঝালদা ব্লকের বেগুনকোদরের উত্তরে অবস্থিত। কংসাবতী নদীর একটি শাখানদী সহরাঝোরের উপর রয়েছে মুরুগুমা বাঁধ। শাখানদী সহরাঝোর ছাড়াও অযোধ্যা পাহাড়ের ছোট, বড় নানান জলধারা এসে মিশেছে বাঁধের জলাশয়ে। আশেপাশে নানান আকৃতির টিলা, সবুজের সমারোহ। প্রকৃতি এখানে অকৃপন। আশেপাশে ছোট ছোট আদিবাসি গ্রাম। সহজ সরল মাটির মানুষগুলি কৃষিকাজ আর পশুপালন নিয়ে জীবনধারণ করেন। এখন গ্রামের কিছু মানুষ কাজের সন্ধানে ঝুঁকছেন অন্য পেশার দিকেও। হোটেল, রিসর্টে কাজ করছেন। এত দিন আধুনিক সভ্যতার বিষ থেকে যতটা সম্ভব নিজেদের আড়ালে রাখলেও এখন আর সেটা কতটা ধরে রাখা যাবে তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ আছে। যত্রতত্র গজিয়ে ওঠা হোটেল, রিসর্ট, শহুরে পর্যটকের ঢল, মেকি বিলাসের হাতছানি এবং স্মার্ট ফোন। বিষবাষ্পের ফনা এখন উদ্যত, প্রকৃতি ও প্রকৃতির মানুষগুলিকে ছোবল মারতে।
আমাদের অবিশ্যি পৌঁছোতে পৌঁছতে প্রায় সন্ধ্যা নেমে এসেছিল। আট ন’ঘণ্টার জার্নিতেও তেমন ক্লান্ত হয়নি কেউ। কারণ পথের দু’পাশের শোভা। হাইওয়ে ছেড়ে ঝাড়গ্রামের পথ ধরতেই একটু একটু করে পালটে গেছিল দু’পাশের ল্যান্ডস্কেপ। লোধাশুলি, বেলপাহাড়ি থেকেই শাল পিয়ালের জঙ্গল শুরু। পেরোচ্ছিলাম জঙ্গলমহলের ছোট ছোট গঞ্জ এলাকা, ব্যস্ত বাজার, তিন বা চার মাথার মোড়। মানুষের কর্মব্যস্ততা, ভিড় দেখতে দেখতে হঠাৎ দেখে ফেলছিলাম রাস্তা ঢুকে পড়েছে জঙ্গলে। ঝিলিমিলি পেরিয়ে যেতেই দু’পাশে ফাঁকা মাঠ, ঝোপঝাড় বা বড় বড় গাছের সমারোহ। ভূপ্রকৃতি বন্ধুর ও মাটির রঙ লালচে (ল্যাটেরাইট)। রাড় বাংলা তার অপরূপ সৌন্দর্যের ডালি মেলে ধরেছিল আমাদের দু’চোখের সামনে অকৃপণ উদারতায়। আমরাও সে সৌন্দর্যের ছটায় উদ্ভাসিত হতে হতে ভুলেছিলাম দীর্ঘ পথযাত্রার ক্লান্তি।
আবিষ্ট হয়ে প্রত্যক্ষ করেছি, আবছা পাহাড়ের ব্যাকড্রপে, দিনের শেষে সুয্যি মামার অস্তাচলে গমন। সূর্যের শেষ রশ্মির সাথে মায়ার বাঁধন ছিন্ন করে, বড় রাস্তা ছেড়ে ছোট রাস্তা, ছোট রাস্তা ছেড়ে গ্রামের গলিপথ পেরিয়ে মুরুগুমা বাঁধের জলাশয়ের পাশ ঘেঁসে এসে পৌঁছেছি রিসর্টে।
বন পলাশী ইকো হাটের মূল ফটকের সামনে গাড়ি থেকে নামতেই মালুম হল শীতের কামড়। অন্ধকার নেমেছে। রিসর্টের ভিতরে আলোগুলো জ্বেলে দেওয়া হয়েছে। গেট থেকে কিছুটা ঢালু রাস্তায় এগিয়ে দেখলাম বিশাল লন, চারপাশে কেয়ারি করা ছোট ছোট গাছ। মরসুমি ফুলের গাছই বেশি। লনের বাঁদিকে পরপর চারটে তাঁবু। চারটে তাঁবুই আমদের জন্য সংরক্ষিত। লনের উল্টো দিকে খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা। ব্যাগপত্তর নিয়ে আমরা হাঁটা লাগালুম তাঁবুর দিকে। বিশ্বরূপ বিড়বিড় করা চালু করেছিল, সেটা দেখেছিলাম আগেই। এবার বিশ্বজিৎও ওর পাশে গিয়ে ফিসফিস করছে দেখে কৌতূহল হল। পিছন থেকে গিয়ে কান পেতে শুনলাম, বিশ্বজিৎ সান্ত্বনা দেবার ভঙ্গিতে বিশ্বরূপকে আশ্বস্ত করছে, ‘চিন্তা করিস নি। এসে গেছি তো। মুড়ি টুড়ি, চপ কিছু একটা দেবে নিশ্চয়ই। কাঁদিস নি।’
৪ঠা ডিসেম্বর, রাত্তির বারোটা।
ডায়েরির শেষটুকু লিখে ঘুমোতে যাব। এবার ক্লান্তি টের পাওয়া যাচ্ছে বেশ ভালই। সন্ধ্যায় সেরকম উল্লেখযোগ্য কোন ঘটনা ঘটে নি। প্রথম তাঁবুতে আমি আর শঙ্খ আছি। পরেরটাতে শান্তনু আর সুজয়, তৃতীয় তাঁবুতে নবারুণ আর বিশ্বরূপ আর শেষ তাঁবুতে শুভাশিস আর বিশ্বজিৎ আছে। নবারুণ ও শুভাশিসদের তাঁবুতে একটি করে বাড়তি খাট বিছানা রাখা আছে। বিভাস এসে এই দুটোর যে কোন একটায় ঢুকে পড়বে।
যে যার তাঁবুতে ব্যাগপত্তর রেখে ফ্রেশ হয়ে চলে এসেছিল ডাইনিং স্পেসে। বেশ খোলামেলা একটি জায়গা এটি। সামনে শান বাঁধানো ছোট চত্বর। চত্বরের ধার ঘেঁষে ফুলগাছের টব। গাঁদা ফুটে রয়েছে দেদার। চন্দ্রমল্লিকা গাছ কুঁড়িতে ভর্তি। পমপম ফুটেছে বেশ কয়েকটা গাছে। জায়গাটা খোলামেলা হওয়ার কারণে বেশ ঠাণ্ডা। পুরুলিয়ার শীত মালুম হচ্ছিল হাড়ে হাড়ে। যথেষ্ট গরম জামাকাপড় গায়ে চাপিয়েও উষ্ণতার ছোঁয়া রয়ে যাচ্ছিল অধরা।
মুড়ি মাখা, ভেজ পকোড়া আর চা নিয়ে জমে গেছিল আড্ডা। শান্তনুর নিষেধাজ্ঞা মাথায় রেখে রাজনৈতিক আলোচনা ইঅ্যাকদম হয় নি। তবে অন্য আলোচনার মধ্যে বেশ হিট করে গেছিল ভূত আর ভূতের ভয় সংক্রান্ত আলোচনা। কাছেই বেগুনকোদর রেল ষ্টেশন। হন্টেড স্টেশন বলে এর একটা খ্যাতি বা কুখ্যাতি আছে। গুজব ডালপালা মেলে ছড়িয়েছে বেশ ভালই। অনেকেই নানান গল্প বলে সোশ্যাল মিডিয়ায়। ভূত দেখতে বা তেনাদের অস্তিত্ব পরখ করতে আসেন অনেকেই। যদিও রিসর্টের কর্মচারীরা পাত্তাই দিলেন না ওসব গালগল্পে। স্রেফ উড়িয়ে দিলেন। কিন্তু উড়িয়ে দিতে পারে নি আমাদের বিশ্বরূপ। প্রবল ভূত প্রেমী সেই বন্ধুটি সমানে তেনাদের পক্ষ নিয়ে তর্ক চালিয়ে যাওয়ার সময় বিশ্বজিৎ চেয়ার ছেড়ে উঠল। গায়ে নীল হুডি। হুডির সামনে লাল সাদা চকরাবকরা আঁকিঝুঁকি। চকচকে টাক কিঞ্চিৎ প্রকাশ্যে। গিয়ে দাঁড়ালো লাল আলোর নিচে। উদেশ্য, বাটি থেকে মুড়ি নেওয়া। নিলো। এবং নেওয়ার সময় দাঁত বার করে হাসল। দাঁতে, টাকে আর চশমায় লাল আলোর রিফ্লেকশন। ছবি উঠল।
ছবিটা দেখে বিশ্বরূপের যে কাঁপুনিটা হচ্ছিল তা যে শুধু শীতের কারণে নয় তা আমি হলফ করে বলতে পারি।
ডিনারে ছিল ভাত / রুটি, ডাল, তরকারি আর মুরগির মাংস। অপূর্ব রান্না। এ রান্নার স্বাদ যে বহুদিন আমাদের মুখে লেগে থাকবে তা বলাই বাহুল্য। আমাদের মোড়লবাবু যেখানে যান সাথে করে তার মন্ত্রপুত চাল নিয়ে যান। এ যাত্রায়ও তার ব্যতিক্রম হয় নি। তিনি সেই চালের ভাত খেলেন। বাকিরা রিসর্টের ভাত। ব্যাপারটা কুঞ্চিত ভ্রূ আর সরু চোখ নিয়ে বেশ কিছুক্ষন লক্ষ্য করার পর বিশ্বরূপ, যে ইতিমধ্যে সব কটা খাবারই টেস্ট করে ফেলেছে, জিজ্ঞেস করেই ফেলল,
‘তুই কি স্পেশাল কোন ভাত খাচ্ছিস মোড়ল?’
‘হ্যাঁ, কেন?’
‘একটু পাওয়া যাবে? টেস্ট করব।’
‘না।’
সপাটে মুখের ওপর এ হেন নেতিবাচক উত্তরের ঝাপটা খেয়ে বিশ্বরূপের চাঁদবদনটি যে রূপ ধারণ করেছিল, তা দেখে বেগুনকোদরের ভূত যে ভাগলবা হবেই হবে এ ব্যাপারে সবাই ছিল নিঃসন্দেহ।
ডিনার পর্ব মেটার পরেও আরও কিছুক্ষণ আড্ডা চলেছে। সাড়ে এগারোটা নাগাদ খেয়াল হল নবারুণ মিসিং এবং ওর তাঁবু থেকে তীব্র নাসিকা গর্জনের আওয়াজ আসছে। বোঝা গেল এবার শুয়ে পড়তে হবে। স্কুলের হলঘরে প্রেয়ার শেষ হলে আমরা যেরকম লাইন দিয়ে ক্লাসে ফিরতাম, ঠিক সেরকম ভাবেই লাইন দিয়ে যে যার তাঁবুতে ঢুকে পড়লাম।
৫ই ডিসেম্বর, সকাল ছ’টা।
শীতের কামড় উপেক্ষা করে তাঁবুর বাইরে এসে কুয়াশা মোড়া এক ভোরের দেখা পেলাম। মায়াবী আলোর তরঙ্গগুলো এদিক ওদিক থেকে বিচ্ছিন্ন ভাবে ঢুকে পড়ছে হালকা কুয়াশার আদরে জড়ানো অস্বচ্ছতার ফাঁক গলে। গাছের পাতাগুলো আশ্চর্য রকমের শান্ত। মায়ার বাঁধন ছিঁড়ে রাতের সঙ্গী শিশিরফোঁটা চুঁইয়ে নেমে যাচ্ছে পাতার আদুরে গাল বেয়ে। একটু পরেই সোনালী রোদের পরশ মুছে দেবে শিশিরসঙ্গ। পাতায়, ডালে উঠে আসবে কীট পতঙ্গের দল। মাকড়সার জাল আর অজানা শব্দের সমারোহ এক আদিম বাস্তুতন্ত্রকে বয়ে নিয়ে যাবে দিনভর। পাখিদের ঘুম ভেঙেছে আগেই। খাবার খোঁজা আর সুর ভাঁজা দুটোই চলছে সমান তালে। তাঁবুর পিছনে আটকে থাকা অল্প অল্প আঁধারছায়া মুখ ফেরাচ্ছে আলোর দিকে। ফ্যাকাশে আকাশের তলায়, বন পলাশীর চারপাশের কুয়াশা মাখা বৃক্ষরাজির অপূর্ব শোভার মাঝে, আলো আঁধারির মায়াময়, না উদঘাটিত হওয়া রহস্যের মধ্যে দঁড়িয়ে নিজেকে সেই জাদু বাস্তবতার জগতের অধিবাসী বলে মনে হচ্ছিলো, যার কোন অস্তিত্বই ছিল না কোথাও কখনো।
লনে হাঁটতে গিয়ে জুতো ভিজছে। শিশিরে ভেজা ঘাস। ফুলের পাপড়িতে একফোঁটা শিশিরকণা ও একফালি রৌদ্রকণার চুম্বনদৃশ্য হয়ে উঠেছে নিস্তব্ধ সৌন্দর্যের এক অপার উৎসব। একে একে তাঁবুর বাইরে বেরোচ্ছে বন্ধুরা। কারও মুখে টুথব্রাশ, কারও হাতে চায়ের কাপ। মোলায়েম প্রাতঃকৃত্যের আশায় গরম জল খাচ্ছে কেউ। তাঁবুতে ঢুকে গেলাম। রেডি হতে হবে।
৫ই ডিসেম্বর, সকাল সাড়ে দশটা।
গাড়িতে উঠে বসেছি আমরা। দুটো গাড়িই স্টার্ট দেওয়ার জন্য রেডি। আজ মধ্যাহ্নভোজের আগে পর্যন্ত মুরুগুমার আশেপাশে কিছু ঝর্না ও জলপ্রপাত দেখতে যাব আমরা। জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে যেতে হবে। রাস্তা দেখিয়ে নিয়ে যাবার জন্য আমাদের সাথে আছেন উত্তম কুমার। উত্তমবাবু পুরুলিয়ার ভুমিপুত্র। থাকেন বাঘমুণ্ডিতে, অয্যোধ্যা পাহাড়ের পাদদেশে। উনি সরকারি ট্রেনিং প্রাপ্ত গাইড। পুরুলিয়ার সব দর্শনীয় স্থানে পর্যটকদের নিয়ে যান। জনপ্রিয় বা অফবিট যে স্থানই হোক না কেন পর্যটকদের চাহিদা অনুযায়ী ভ্রমণসূচী ছকে দেন। দুর্গম কোন দ্রষ্টব্যের জন্য ট্রেকিং এর বন্দোবস্তও করে থাকেন। পেশায় গৃহশিক্ষক এই মানুষটি আমাদের সাথে আজ আর কাল, এই দু’দিন থাকবেন। ওনার সাথে আজ মুরুগুমা ও কাল অযোধ্যা পাহাড়ের আশেপাশে কিছু দর্শনীয় স্থানে যাব, তেমনই পরিকল্পনা।
সকালে সব কিছু রুটিন মাফিক ছিল। সবাই বেশ কিছুক্ষণ রোদ পোহাল লনে। কেউ কেউ এদিক ওদিক গাছপালা, ফুল, পোকামাকড়ের ছবি তুলল সাথে নিজেদের সেলফিও তুলল। সেলফি পছন্দ না হওয়ায় দাঁত কিড়মিড় করে ফিসফিসিয়ে নিজেকে নয়, মোবাইলকে গালি দিল। এরপর একপ্রস্থ চা পর্ব সেরে সবাই ফ্রেশ হতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
ব্রেকফাস্টে ভালই আয়োজন দেখে সাবাই খুব খুশি। রুটি, লুচি, ভাত, তরকারি, ব্রেড, বাটার, জ্যাম, ডিম সেদ্ধ, অমলেট, মিষ্টি, চা, বিস্কুট, যার যা পছন্দ খাবার সাজানো ছিল ডাইনিংএ। রিসর্টের লক্ষণদা ও অন্যান্য কর্মচারীরা সেসব যত্ন নিয়ে পৌঁছে দিচ্ছিলেন সবার প্লেটে। বিশ্বরূপ দায়িত্ব নিয়ে সব আইটেম চেখে দেখে জানাল, ‘ব্যবস্থা ভালই।’
গাড়ি চলতে শুরু করেছে পাহাড়ি পথ ধরে। সরু পাকদণ্ডী রাস্তা ধরে গাড়ি উঠছে পাহাড়ে। রাস্তার দুপাশে জঙ্গল। শাল, পলাশ, মহুয়া, কুসুম, নিম, কেন্দু, পিয়াল, বাঁশ সহ নানা ধরনের গাছপালা ও ভেষজ গাছ পাওয়া যায় সে জঙ্গলে, যা স্থানীয়দের জীবিকার অন্যতম উৎস। গাছের পাতা সকালের কাঁচা রোদে চকচক করছে। নিচে দেখা যাচ্ছে ছোট ছোট সবুজ পাহাড়ে ঘেরা মুরুগুমা ড্যাম, কালচে সবুজ জঙ্গল আর বিস্তীর্ণ জলাশয়। পাহাড়ি পথে চলতে চলতে পেরিয়ে যাচ্ছি ছোট ছোট গ্রাম। চাষের জমি। বানভুটু, মামুডি, জিলিংসেরেং… বড় সুন্দর সে গ্রামগুলির নাম। শান্ত গ্রামগুলি নগর সভ্যতা থেকে অনেক অনেক দূরে। পরিকাঠামোগত দিক থেকে এখনও অনুন্নত। খুবই সীমিত সুযোগ সুবিধের মধ্যে সহজ সরল জীবনযাপনে অভ্যস্ত তাঁরা। গ্রামে বিদ্যুৎ আছে, নলকূপের জল আছে। মূল রাস্তা পাকা হলেও, গ্রামের রাস্তা কাঁচা। প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে কিন্তু উচ্চ শিক্ষার জন্য অন্যত্র পাড়ি দিতে হয়। যাতায়াতের গণপরিবহন ব্যবস্থা কিছু চোখে পড়ল না। পায়ে হাঁটা বা সাইকেল, কারোর মোটর সাইকেল, এই ভরসা। চিকিৎসার জন্য যেতে হয় প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্রে বা জেলা হাসপাতালে। অনেক কিছু নেই এর মধ্যেও কর্মঠ মানুষগুলির আড়ম্বরহীন দিনযাপনে প্রাণচঞ্চলতার ছাপ স্পষ্ট। পুরুষ মহিলা নির্বিশেষে কেউ মাঠে ধান তুলছেন, কেউ গরু ছাগলের পাল নিয়ে চরাতে চলেছেন, কেউ কাঠ আর পাতা সংগ্রহের জন্য জঙ্গলে চলেছেন। গ্রামের সামনে ছাগল, মুরগি নিজেদের খাবার সংগ্রহে ব্যস্ত। মহিলারা জল তুলছেন নলকূপ থেকে। অপূর্ব সুন্দর তাঁদের ঘরবাড়ি। মাটির দেওয়ালে হাতে আঁকা ফুল লতা পাতার নিসর্গচিত্র। মহিলারা কোন পরবের/ উৎসবের সময় আঁকেন এই দেওয়ালছবি। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ঘরদোর, দাওয়া, উঠোন দেখে নিজেদের জন্য করুনা হয়। Cleanliness is next to godliness.. এটা ওনাদের পায়ের কাছে বসে শেখার আছে আমাদের।
গাড়ি চলছে। সামনে শঙ্খর নির্দেশাবলীর রানিং কমেন্ট্রি চলছে। সেই অনুযায়ী গাড়ির স্টিয়ারিং ঘুরছে। গতি বাড়ছে কমছে। রাস্তা বড়ই অপরিসর। তার মধ্যে উল্টোদিক থেকে গাড়ি এলে, আগে পিছে করে কোনরকমে পাশ কাটাতে হচ্ছে। আমাদের অন্য গাড়িটা হুশ হুশ করে বেরিয়ে যাচ্ছে। অবিশ্যি আমাদের গাড়ি আটকে গেলে ওই গাড়ির চালক সৌরভ, সানগ্লাস পরে বেরিয়ে এসে গাড়ি চালকদের গাইড করে যানজট কাটিয়ে দিচ্ছে। একবার সানগ্লাস ছাড়া গাড়ি থেকে নেমে কিছুতেই সুবিধে করতে পারছিল না। গাড়িতে ফিরে গিয়ে সানগ্লাস পরে এসে আটকে যাওয়া মুখোমুখি দুটো গাড়িকে আনায়াসে পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে যাবার ব্যবস্থা করে দিল।
বিশ্বরূপ দু’বার খুখু বলল। নিশ্চয়ই খুব খিদে পেয়েছে ওর। জিজ্ঞেস করলাম,
‘হ্যাঁরে খিদে পেয়েছে নাকি? খু খু করছিস কেন?’
‘ও একটু সর্দি মত হয়েছে। ঠাণ্ডা তো। আর খিদে? ধুর, হাসালি, এই তো জাস্ট এত কিছু ব্রেকফাস্টে খেয়ে বেরোলাম। এখনি কি খিদে পাবে? একদম পায় নি। ওই পেটটা একটু চুঁইছুঁই করছে, এই যা।’
৫ই ডিসেম্বর, দুপুর সাড়ে বারোটা।
মাছকাঁদা ঝর্না দেখে চলেছি এখন পিতিদিরি ঝর্নার দিকে। উপর এবং জলতল, দু’দিক থেকেই দেখেছি মাছকাঁদা ঝর্না। দু’পথে গিয়ে। যাবার পথ এবং ঝর্না ও তার চারিপাশের নৈসর্গিক দৃশ্য দেখে অপূর্ব শব্দটিকে বড্ড জোলো বলে মনে হল।
মুরুগুমা থেকে পাহাড়ে উঠে বেশ কিছু পথ চলার পর, প্রায় মিনিট চল্লিশেক বাদে, মামুডি থেকে গাড়ি বাঁদিকে ঘুরে উঠে এসেছিল রাঙ্গাখামার রোডে। সেই শাল পিয়াল মহুয়ার জঙ্গল দু’পাশে নিয়ে কালো পিচের রাস্তা ধরে গাড়ি ছুটল খামার রোড ধরে। কিছুক্ষণ বাদে উত্তমবাবুর নির্দেশে গাড়ি থামল রাস্তার ধারে।
‘চলুন, উলটো দিকে জঙ্গলের পথে একটু নিচে নামতে হবে।’
উত্তমবাবুর কথা শেষ হবার আগেই ঝুপঝাপ করে সবাই গাড়ি থেকে নামতে শুরু করে দিল।
পাকা রাস্তা পেরিয়ে দেখলাম উলটো দিকের শালবনের মধ্যে দিয়ে চলে গেছে একটি পায়ে চলা রাস্তা। লাল মাটির সে রাস্তা মোরাম কাঁকড়ে ভরা। সবাই চললাম সে পথে। পথ ক্রমশ ঢালু হয়ে নিচের দিকে নেমেছে। দু’পাশের কেন্দু, শাল, পলাশ আর হরিতকি গাছের ঘন পাতা ডালপালার ফাঁক গলে চুপিসাড়ে, ফিসফিস করে আমাদের স্বাগতম জানাতে, সূর্য কিরণ, সোজা রেখায় নেমে এসেছে মাটিতে। বাইরে রোদের বেশ তাপ কিন্তু জঙ্গল পথে যেন হাওয়ায় হাওয়ায় শিরশিরে ঠাণ্ডার আমেজ, ঠিক অদৃশ্য কোন এক কবিতার মত, যা শরীরকে ছুঁয়ে মনে লিখে যায় নিস্তব্ধতার গভীরতম উপাখ্যান।
‘এই এই গেল রে, এ বাবা, তোল তোল’ নবারুণের আচমকা চিৎকার শুনে আমরা সেদিকে তাকিয়ে দেখি শুভাশিস মাটিতে শুয়ে। প্রথমে ভেবেছিলাম প্রকৃতি প্রেমে আচ্ছন্ন হয়ে ভূমিতে শয্যা পেতেছে। পরে শুনলাম ওর জুতোর সোল আর রাস্তার মোরামের মধ্যে এক নিদারুণ সংঘর্ষের পর সোল রণে ভঙ্গ দিয়েছে, আর তাই ও পা হড়কে পপাত ধরণীতল।
‘সরে যা, সরে যা’ বলতে বলতে, ঠোঁট ঝুলিয়ে, ঘাড় গুঁজে, ছুটতে ছুটতে, হাঁপাতে হাঁপাতে দৌড়ে এল বিশ্বজিৎ। শুভাশিস পড়ে গেছে দেখে ও আর চুপ থাকতে পারে নি। ছোটবেলা থেকে হরিহর আত্মা বন্ধু ওরা। এর হাসি পেলে ও হাসত, ওর কান্না পেলে এ কাঁদত। ওর খিদে পেলে এ খেয়ে নিত, এ বাথরুম থেকে বেরোলে ও জল ঢালত, এই লেভেলের বন্ধুত্ব। বিশ্বজিৎ ঝাঁপিয়ে পড়ল শুভাশিসকে তুলতে। পঞ্চান্ন কেজি কি আর পারে পঁচাশি কেজিকে তুলতে! লম্ফঝম্পই সার, “সর সর” বলে সেকালের ছোটা এখনকার বড়া ভীম, সুজয়, টেনে তুলল শুভাশিসকে। শুভাশিস উঠে দাঁড়ানোর পর বিশ্বজিৎ যেভাবে হাত টাত ঝেড়ে, দু’বার হুহ করে দম ছাড়ল, তাতে ও যে ওপর থেকে গামা বা গোবর গুহ’র আশীর্বাদ এক্সপেক্ট করছিল, এ আমি নিশ্চিত।
আবার সবাই এগোতে শুরু করল গাইডের দেখানো পথ ধরে। পা চেপে হাঁটছে শুভাশিসও, যাতে আর পদস্খলন না হয়। অল্প কিছুটা ঢালু পথে এগিয়ে বাঁদিকে ঘুরেই এ পাহাড় থেকে দেখলাম ও পাহাড়কে। উলটো দিকে। কালচে সবুজ জঙ্গলে ঢাকা। ডান, বাঁ, দুপাশে তার বিস্তার। সে পাহাড়ের বাঁ পাশে কিছুটা নিচের দিকে ঘন জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে, পাথরের গা বেয়ে নেমে আসছে ঝর্নার জল। পাহাড়ের সংকীর্ণ পথ বেয়ে আপন গতিতে চলেছে ঝর্না, এদিক ওদিক শাখা বিস্তার করে। মাছকাঁদা বা মাছকান্দা ঝর্না।
যেখানে দাঁড়িয়ে ছিলাম তার সামনেই একটা বিশাল চ্যাপ্টা পাথর। ওপরটা সমতল ও অনেকটা ক্যান্টিলিভারের মত সামনে বেরিয়ে রয়েছে ঝুলন্ত অবস্থায়। নিচে অতলস্পর্শী খাদ। একে কেউ কেউ সুইসাইড পয়েন্টও বলে থাকে। অসাবধানে পা হড়কালে মৃত্যু অনিবার্য। খাদের ওপর ঝুলন্ত পাথরটি থেকে ঝর্নার অপরূপ সৌন্দর্য আরও ভাল ভাবে প্রত্যক্ষ করা যায়। ছবিও ভাল আসে। সবাই সেই পাথরে উঠে ঝর্নার ছবি তুলল। এপারের পাহাড়ে রোদ ঝলমল করছে। জঙ্গল ঝকঝকে সবুজ। ওপারে ঝর্নার পাহাড়ে ছায়া। আবছা অন্ধকারের রেশ মেখে, কালচে সবুজ জঙ্গল আর পাথরের মধ্যে দিয়ে সাদা ফেনা ছুটিয়ে নেমে আসা ঝর্নার বহমানতা যেন নীরব কোনও সুর, যা বাতাসের ডানায় চেপে কাছে আসে খুব সন্তর্পণে।
পাশ থেকে একটা আঁ আঁ আওয়াজে একটু মিহি করে ঘাবড়ে গিয়ে পাশ ফিরে দেখি বিশ্বরূপ চোখ বড় করে চেয়ে, হাত তুলে ঝর্নাটা দেখাচ্ছ। ওদিকে ভয়ঙ্কর কিছু ঘটেছে কিনা ঠাহর করার চেষ্টার মাঝেই শুনলাম বিশ্বরূপ বলে উঠল, ‘আঁশ্চর্য সুন্দর ঝর্না, তাঁই না?’
শান্ত হলাম। অপূর্ব নিসর্গ প্রত্যক্ষ করার উচ্ছ্বাসে ওর শব্দ যে শুধু আটকে গেছিলো তাই নয়, সর্দি আবার তাতে চন্দ্রবিন্দু বসিয়ে ঘাবড়ে দিয়েছিল।
ফিরে আসার পথে শুভশিস হালকা করে দু’একবার হড়কেছিল বটে কিন্তু বিশ্বজিতের গাঁক গাঁক করে ধেয়ে আসার মত কেলেংকারি কিছু ঘটে নি।
খামার রোডে ফিরে আসার পর উত্তমবাবু জিজ্ঞেস করলেন আমরা কিছুটা হাঁটতে পারব কিনা, তাহলে উনি এই ঝর্নাটির একটি অংশ আরও একটু কাছ থেকে দেখাবেন। না বলার কোন কারণ ছিল না, বলাও হয় নি। অত:পর উঠে পড়া গেল গাড়িতে এবং গাড়ি কিছুক্ষন চলে আবারও থেমে গেল উত্তমবাবুর নির্দেশে। রাস্তা পার হয়ে আবার জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে মেঠো পথ ধরলাম আমরা। সেই একই জঙ্গল। একই রকম ছায়াঘন ঠাণ্ডা পরিবেশ। তবে এ রাস্তায় নুড়ি পাথর কম। শুভাশিস তাই স্বস্তিতে হাঁটছিল যদিও বিশ্বজিতের কড়া নজর ছিল ওর ওপর। পড়ে গেলে চেঁচিয়ে সুজয়কে ডাকবে বলে তৎপরও ছিল, যদিও এযাত্রায় সেরকম অমঙ্গলজনক কিছু ঘটে নি।
বেশ কিছুটা পথ নেমে আসার পর জলের আওয়াজ পাওয়া গেল। সামনে তিরতির করে বইছে পাহাড়ি নালা। ছোট নদী বলা যেতে পারে। এ পাথর সে পাথর ডিঙিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে নিচে নামছে জলধারা। নালার পাশে এসে আমরা একে একে পাথর টপকে টপকে চলে গেলাম নালার ওপাশে। উদ্দেশ্য আরও কিছুটা এগিয়ে আরও সামনে থেকে ঝর্নার রূপে অবগাহন করা। শুরু হল উঁচু নিচু পাথর ডিঙিয়ে এগোনো। সে বড় ঝুঁকি আর পরিশ্রমের কাজ। নানা কসরৎ করে আমরা এগোলাম সে পথে। কিছুটা এগিয়ে রনে ভঙ্গ দিল শঙ্খ। সুজয়, শান্তনু আর বিশ্বরূপ তরতর করে এগিয়ে গিয়ে ঝর্নার পাশে ছবি তুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। কিছুক্ষন পর হাঁফাতে হাঁফাতে, হাঁচর পাঁচর করে বিশ্বজিৎ ও এসে উপস্থিত হল।
‘কি ভেবেছিলি, পারব না? নে, ছবি তুলে দে।’ বলতে বলতে বিশ্বজিৎ ঝর্নার পাশে পোজ দিয়ে দাঁড়াল।
পেরিয়ে আসা নালাটা ওপর থেকে সগর্জনে আছড়ে পড়ছে নিচে। ছোট একটি পুলের মত জলাশয় তৈরি হয়েছে সেখানে। তারপর আরও একটু নিচে লাফিয়ে নেমে, ছোট বড় নানান পাথরের মধ্যে দিয়ে পথ করে নিয়ে এগিয়ে চলেছে সফেন জলরাশি নিজ গন্তব্যে। চারপাশে রুক্ষ পাথর, খয়েরি, বাদামি ও কালচে রঙের। অজস্র রকমের গাছপালার মধ্যে চিনতে পারলাম বুনো কুল গাছ। ছোট ছোট কুলও হয়েছে। প্রচুর ছবি তোলা হল। বিশ্বরূপ একাই প্রায় শ’খানেক সেলফি তুলল। দেখাদেখি নবারুণও চেষ্টা চরিত্তির করল কিছুক্ষন সেলফি তোলার। তেমন জুতসই হল না বলে শুভাশিসকে মিষ্টি করে অনুরোধ করে নিজের খান বিশেক ছবি তোলাল।
ফেরার পথে উল্লেখযোগ্য কিছু ঘটে নি। তবে খাড়া রাস্তা বেয়ে ওপরে উঠে আসার সময় বয়সটা জানান দিচ্ছিল দ্রুতগতির শ্বাস প্রশ্বাসের মাধ্যমে।
পিতিদিরি ঝর্না খুব সামনেই, এসে গেছি প্রায়।
৫ই ডিসেম্বর, দুপুর তিনটে।
মধ্যাহ্নভোজন শেষ করে এবার প্রস্তুত হচ্ছি পরবর্তী গন্তব্যের জন্য। পিতিদিরি ঝর্না ও মড়াভাসা ড্যাম দেখে তারপর রিসর্টে এসেছি লাঞ্চ করতে। তবে সে বর্ণনায় যাবার আগে আমাদের লাঞ্চের মেনুটা একবার বলে দিই। গরম ভাতের সাথে ডাল, ভাজা, সব্জি, মাছ, চাটনি আর পাঁপড় ভাজা। রান্নার স্বাদ অপূর্ব। খিদের মুখে এমন রান্না যেন অমৃত। বিশ্বরূপ পাঁপড় ভাজা খেল না, কারন পাঁপড় কিডনি ড্যামেজ করে দিতে পারে বলে ওর ধারণা। শান্তনু পাঁপড় থেকে কিডনি পর্যন্ত রোডম্যাপ ধরে ধরে ওকে অনেক বোঝাবার চেষ্টা করলেও ভবি ভোলবার নয়, ভুললও না।
মাছকাঁদা ঝর্না দেখে, মিনিট কুড়ি গাড়িতে চড়ে, দু’তিনটি গ্রাম পেরিয়ে, একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় পেরিয়ে, এলাম পিতিদিরি। গাড়ি থেকে নেমে শুরু হল হাঁটা। এবার সমতলে হাঁটা। প্রথমে ঝোপঝাড়ে ভরা এবড়ো খেবড়ো একটা মাঠ পেরিয়ে নেমে এলাম চাষের জমিতে। ধান কাটা হয়ে গেছে। গাছের গোড়াগুলো রয়ে গেছে। সে জমির আল ধরে কিছুটা এগিয়ে পেরোলাম একটা শীর্ণকায় নালা। তারপর আবার হাঁটা শুরু হল মেঠো পথ ধরে। প্রায় মিনিট সাতেকের হাঁটা পর্বের শেষটুকু ছিল পাথুরে পথ। আসলে কোন পথই ছিল না। ছোট বড় পাথর নানা কসরৎ করে পেরোচ্ছি যখন, তখন ভেজা হাওয়ার হিমেল ছোঁয়া আর জল বয়ে যাবার শব্দে মালুম হল, গন্তব্য আগচ্ছতি।
তিনটি বাচ্চা মেয়ে, পাথরের তলদেশ থেকে বহমান ঠাণ্ডা জলের আবরণ সরিয়ে খুঁজে আনছে ছোট ছোট কাঁকড়া। বিশালাকায় পাথরের জেলখানা ভেঙ্গে নিজের পথ খুঁজে নিয়ে দৌড়চ্ছে জলধারা আরও দূরের পথে, অজানা কোন গন্তব্যে। একজন রোদে পোড়া জলে ভেজা, কর্মঠ মানুষ একটি ছোট জাল নিয়ে পরিশ্রম করে চলেছেন দু’চারটে কুচো মাছ পাবার আশায়। জলাশয়ের ধারে একজন অতি বৃদ্ধ মানুষ পাথরে হেলান দিয়ে আমাদের পর্যবেক্ষণ করছেন নির্নিমেষ। আর এসবের উলটো দিকে সমতল থেকে সবেগে এসে নিচের পাথরে আছড়ে পড়ছে সফেন জলরাশি। এই সমস্ত টুকরো টুকরো প্রকৃতি আর মানুষের যে আসামান্য কোলাজ, সেটিই পিতিদিরি ফলস।
আদিম প্রকৃতির নিজস্ব নিয়মে আবহমান কাল ধরে এই পাহাড়, জঙ্গল আর পাথরের ফাঁক গলে বয়ে চলা ঝর্নার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মনে হল, ধুলো জমা চিন্তার আবর্জনাগুলো ধুয়ে যাচ্ছে আর আমাদের মন ক্রমশ হয়ে উঠছে হালকা, নরম, আর স্বচ্ছ। ছবি তোলা হল দেদার। ছোট, বড় নানান সাইজের পাথরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আমরা দাঁড়িয়ে, জলাশয়ের ধারে। ঝর্নার শোভা দেখা আর নিজেদের মধ্যে খুনসুটি দুটোই চলছে। আমাদের সাথে এসে যোগ দিয়েছে ওই বাচ্চা তিনটি ও বৃদ্ধ মানুষটি। খুদেরা দেখাল তাদের ধরা কাঁকড়া। বৃদ্ধ জানালেন তাঁর বয়স নব্বইয়ের ওপরে। বিস্মিত হই নি। প্রকৃতির কোলে দূষণ মুক্ত পরিবেশে এঁদের জন্ম ও বেড়ে ওঠা। ভেজাল ও বিষাক্ত রাসায়নিক মুক্ত খাবার। রোদে, জলে, হাওয়ায় সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পরিশ্রম। বেশি রাতে ঘুমোতে না যাওয়া বা রাত না জাগা, সাধারণ স্বাস্থ্যবিধির এই সমস্ত গোড়ার কথাই তাঁদের সুস্থ, নীরোগ ও দীর্ঘায়ু থাকার মূল কারণ। যদিও বর্তমান পরিস্থিতি যথেষ্ট উদ্বেগজনক। প্যাকেটে, বোতলে ভরা খাবার, জল পৌঁছে গেছে প্রত্যন্ত এলাকায়। ক্ষতিকর প্রসেসড ফুডের লোভনীয় হাতছানি সেখানেও থাবা বসিয়েছে। স্মার্টফোনে মজে অল্পবয়সী ছেলেরা। কর্পোরেটের নাছোড় স্ক্যানারে প্রত্যন্ত ও দুর্গম এলাকাগুলোতেও ধরা পড়ছে বাজার।
উত্তমবাবুর কথায় ফেরার পথ ধরলাম। এরপর মড়াভাসা ড্যাম দেখে রিসর্টে ফিরে লাঞ্চ করে আবার বেরোতে হবে। তাই মন না চাইলেও ফেরার পথ ধরতে হল। নইলে দেরি হয়ে যাবে। আবার সেই পাথুরে জায়গাটা পেরিয়ে, মাঠ, ধান জমি, আল পথ, নালা পার করে, ঝোপঝাড়ের পাশ ঘেঁসে এসে পৌঁছলাম আমাদের গাড়ির কাছে। গাড়ি ছুটল গ্রাম পেরিয়ে জঙ্গলের পথ চিরে। যাবার পথে দুরের পাহাড়গুলোর সাথে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছিলেন উত্তমবাবু। সেই সুত্রেই পরিচয় হয়ে গেল কিঞ্চিৎ ন্যাড়া পাহাড় গজাবুরুর সাথে। সবুজ জঙ্গলে আচ্ছাদিত চেমটাবুরুর সাথে। চেমটাবুরু দক্ষিন বঙ্গের সবচেয়ে উঁচু পাহাড়। অযোধ্যা পাহাড় রেঞ্জের এই পাহাড়টির শৃঙ্গ সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৭২০ মিটার উচ্চতায়। ছোটনাগপুর মালভূমির একটি অংশ, এই পাহাড়, রক ক্লাইম্বিং ও ট্রেকিংয়ের জন্য বেশ জনপ্রিয়। প্রায় ৬৭৫ মিটার উঁচু গজাবুরু পাহাড়েও ট্রেকিং ও রক ক্লাইম্বিং হয়। জানতে পারলাম, সাঁওতালি ভাষায় বুরু শব্দের অর্থ পাহাড় এবং ডিহি মানে গ্রাম।
মিনিট কুড়ি বাদে গাড়ি এসে থামল একটি গ্রামের শেষ প্রান্তে। গ্রামের নাম পাড়রি। এখান থেকে দু’মিনিট হেঁটে মরাভাসা বা মড়াভাসা বাঁধ। এই বাঁধের এমনতর নাম কেন তা আর জানা হয় নি। গাড়ি থকে নেমে শুরু হল পথচলা। গ্রামীণ মেঠো পথ ছাগল, মুরগিদের বিচরণ ক্ষেত্র। তাদের পাশ ঘেঁসে গিয়ে উঠলাম বাঁধের ওপর। রাস্তা চলে গিয়েছে বাঁধের ওপর দিয়ে। বাঁ পাশে বিস্তীর্ণ জলাশয়। ড্যামের জল পাহাড়ের বাঁকে ঘুরে অদৃশ্য হয়ে গেছে। পাহাড়ের ওপাশেও এই জলাশয়ের অনেকটা অংশ আছে, তেমনটা জানালেন গাইড। জলাশয়ের বাঁদিকে ডানদিকে, দু’দিকেই পাহাড়। তাদের প্রান্তসীমা এসে মিলেছে জলের ওপর। ঘন সবুজ দুই পাহাড়ের অর্ধচন্দ্রাকৃতি মিলনরেখা অপূর্ব প্রতিবিম্ব নির্মাণ করেছে হালকা সবুজ স্থির জলের উপরিতলে। নিভৃত, শান্ত, গভীর সে প্রতিবিম্ব যেন ঢেউহীন জলরাশিতে আঁকা একটি নিঃশব্দ মায়া, যে মায়ায় প্রকৃতি নিজেই নিস্তব্ধ হয়ে গেছে নিজের সৌন্দর্যের প্রতিচ্ছবি দেখে।
এই বাঁধ, এই জলরাশি, হাতের নাগালে চেমটাবুরু, এই অপার নিস্তব্ধতা আমাদের মোহাবিষ্ট করেছিল কিয়ৎক্ষণ। তারপর যা হয়, পটাপট মোবাইল ক্যামেরায় ক্লিক। আমদের গাইড উত্তমবাবুও এই নিসর্গ ব্যাকড্রপে রেখে নিজের কয়েকটি ছবি তুলিয়ে নিলেন। এরপর রিসর্টে ফেরার পালা। আমাদের লাঞ্চ অপেক্ষা করছে সেখানে। খিদেও পেয়েছে বেশ। বিশ্বরূপ তিড়িং তিড়িং করে দৌড়ে গাড়িতে ওঠার পর শান্তনুকে জিজ্ঞেস করল,
‘আজ একটু তোর ভাতটা টেস্ট করতে দিবি তো ভাই?’
‘না। কোন টেস্ট ফেস্ট হবে না।’
বিশ্বরূপের মুখ দেখে প্রকৃতিরও বোধহয় মায়া হল। রোদ পড়ে এল। উল্টোদিকের গজাবুরু পাহাড়ের নিচের জঙ্গল আরও কালচে সবুজ হয়ে উঠল।
৫ই ডিসেম্বর, সন্ধ্যা ছ’টা।
কিছুক্ষন হল তাঁবুতে ফিরে এসেছি। সারাদিনের ধকলে ক্লান্ত থাকার কথা। কিন্তু ক্লান্তি কাউকেই কাবু করে নি। কারণ একটি সূর্যাস্ত। এমন একটি সূর্যাস্ত দেখার জন্য অনায়াসে পাড়ি দেওয়া যায় হাজার মাইল পথ।
মধ্যাহ্নভোজ সেরে সময় নষ্ট না করে গাড়িতে উঠে বসা হয়েছিল। দুটো জায়গায় যেতে হবে। শীতের বিকেল বড় স্বল্পায়ু। দেখতে দেখতে সন্ধ্যে নেমে আসে। এখনি সূর্য পশ্চিমে ঢলতে শুরু করেছে। অতএব সময় নষ্ট করা চলবে না।
মুরুগুমা বাঁধের ওপর দিয়ে পূর্ব দিকে ছুটল গাড়ি। বাঁধ পেরিয়ে ওপাশের পাহাড়ের পাকদণ্ডী পথ বেয়ে শুরু হল খাড়াই রাস্তায় চড়া। রাস্তা ক্রমশ সরু হতে হতে এমন পর্যায়ে পৌঁছল যেখানে একটি গাড়িই কোনমতে যেতে পারে। উলটোদিক থেকে গাড়ি এলে এগোনো প্রায় অসম্ভব। উত্তমবাবু বললেন প্রায় ৫ কিলোমিটার এমন রাস্তায় যেতে হবে, তারপর চওড়া রাস্তা পাওয়া যাবে। দু’পাশে ঘন জঙ্গল, ঝোপঝাড়। হর্ন দিতে দিতে আমাদের দুটো গাড়ি এগোচ্ছে। সময় কম বলে গাড়ির গতিও বেশ ভালই। প্রথমে কালাদার গাড়ি, পিছনে সৌরভের। কিছুটা যেতে না যেতেই বিপত্তি। আমাদের প্রভুত বিরক্তির জন্ম দিয়ে উলটোদিকে একটি মূর্তিমান বড়সড় গাড়ি এসে হাজির। ব্যাস পুরো ডেডলক সিচুয়েশন। সব গাড়িই স্ট্যান্ড স্টিল। অনড়। এদিকে সময় বয়ে যাচ্ছে। অসহায় ভাবে পিছনে তাকিয়ে দেখি, পিছনের গাড়ি থেকে নামছে, সে নামছে। সৌরভ। টেনশন কমল। তারপর টেনশন পুরোই গায়েব হয়ে গেল যখন দেখলাম ওনার চোখে সানগ্লাসটি আছে। সানগ্লাস পড়া সৌরভের কাছে এসব টুসকি। নামল। এ গাড়ির, ও গাড়ির চালককে কিছু পরামর্শ দিল। সেইমত ওরা এগোল, পেছোল। দু’মিনিট বাদে আমাদের গাড়ি আবার ছুটতে শুরু করল গন্তব্যে।
চারটে নাগাদ আমরা এসে পৌঁছলাম একটি গ্রামের মধ্যে। গ্রামের নামটি বেশ সুন্দর। ঘাটিয়ালি। গাড়ি এই ঘাটিয়ালি গ্রামে রেখে বাকিটা পদব্রজে যেতে হবে। গ্রামটি বেশ বড় ও পরিচ্ছন্ন। সন্ধ্যের মুখে ছাগলের পাল ঘরে ফিরছে। গরু নিয়ে ফিরছে রাখাল। বাচ্চারা খেলা করছে। কয়েকজন বয়স্ক মানুষ ইতিউতি বসে আমাদের নিরীক্ষণ করছেন। শঙ্খ একটি ছাগল ছানা কোলে তুলে নিয়ে আদর টাদর করছিল। বোধকরি কলকাতায় নিয়ে আসার প্ল্যান ভাঁজছিল। কিন্তু গাইডের তাড়ায় তাকে কোল থেকে নামিয়ে হাঁটা শুরু করতে হল।
পায়ে চলা পথ। দু’পাশে চাষের জমি। মাঝে মাঝেই দেখছি জমির ওপর দিয়ে ক্ষীণ জলধারা বইছে। সেচের জল। ঢালু পথে নামছি নিচের দিকে। চাষের জমি শেষ হয়ে জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে পায়ে চলা পথ শুরু হল। লাল মাটির পথ। নুড়ি পাথর বেশ ভালই আছে। পা চেপে চেপে হাঁটতে হচ্ছে। জঙ্গলের ফাঁকে ফাঁকেই কিছুটা করে পাথুরে জমিকে চাষ যোগ্য করা হয়েছে। সেখানে কিছু একটা চাষও করা হয়েছে। রাস্তা ক্রমশ সরু হয়ে নিচের পানে চলেছে। এরপর আর কোন চাষের জমি নেই। পুরোটাই জঙ্গল। পথে পেরোতে হল একটা ক্ষীণ নালা। পেরোতে হল কিছুটা পাথুরে জমি। জল বয়ে যাওয়ার শব্দে বুঝতে পারা যাচ্ছিল ঝর্না খুব কাছেই। ঠিক তাই। বড় বড় কয়েকটি পাথরকে পাশ কাটিয়ে, কিছু মাঝারি সাইজের পাথর টপকে আমরা এসে দাঁড়ালাম যেখানে, ঠিক তার সামনে দিয়েই ছল ছল করে বয়ে যাচ্ছে ছলছলি ফলস।
জলপ্রপাত তো নয়ই, এরকম ঝর্নাও এর আগে বেশি দেখেছি বলে মনে পড়ছে না। ওপর থেকে নিচে আছড়ে পড়া নেই। প্রায় সমতল পাথরের স্তরের ওপর দিয়ে নদীর মত বয়ে যাচ্ছে ছলছলি ঝর্না। পার্থক্য এই যে নদীর মত একটি জলধারা নয় বরং শাখা প্রশাখা বিস্তার করে বেশ কয়েকটি জলধারা নিয়ে বয়ে চলেছে ছলছলি। খরস্রোতা নয়, উচ্চতার পার্থক্য হেতু যেটুকু বেগবান হবার, সেই বেগেই ছুটে চলেছে সে আপন খেয়ালে। গাইড জানালেন, বর্ষায় এর রূপ আরও খোলতাই হয়। জলের পরিমান অনেক বাড়ে। আরও স্রোতস্বিনী হয়ে ওঠে। আমরা যেখানে দাঁ দাঁড়িয়েছিলাম সেই পাথরগুলোও চলে যায় জলের তলায়। এখনই এই ঝর্নার বিস্তার ব্যাপক। অনেকটা জায়গা নিয়ে সে দৃশ্যমান। শেষ বিকেলের কাঁচা সোনা রোদের ছটায় এ ঝর্নার রূপ সত্যিই মনোমুগ্ধকর।
শান্তনু অনেকক্ষণ ঝর্নার জলধারার পানে তাকিয়ে থেকে শঙ্খকে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল, ‘এই জল তো ওপর থেকে ডাইরেক্ট মিনারেল গুলে আনছে, খেলে।BS কমবে?’ শঙ্খ ওর দিকে যে দৃষ্টিতে তাকিয়েছিল তাতে বিগলিত করুণা ধারা যে অবিরাম ছিল এ আমি হলফ করে বলতে পারি।
পরবর্তী গন্তব্য, পাহাড়ের ওপর একটি ভিউ পয়েন্ট, যেখান থেকে সূর্যাস্ত প্রত্যক্ষ করব। সময়ে পৌঁছতে হবে সেথায়। অতএব ছলছালকে ছলছলিকে বিদায় জানিয়ে ফেরার পথ ধরলাম আমরা। মিনিট সাতেকের মধ্যে ঘাটিয়ালি গ্রামে পৌঁছে উঠে পড়া গেল গাড়িতে। গরু ছাগলের পাল কে পাশ কাটিয়ে গ্রামের রাস্তা থেকে বেরিয়ে মূল রাস্তায় পড়া গেল। সে রাস্তা ধরে মুরুগুমার দিকে ছুটল গাড়ি। আবার সেই পাহাড়ের সরু রাস্তা ধরে জঙ্গল ভেদ করে যাওয়া। আধঘণ্টার মধ্যে আমরা পৌঁছে গেলাম উকামবুরু ভিউ পয়েন্টের কাছে। রাস্তায় ছোট, বড় অনেক গাড়ি পার্ক করা। পর্যটকরা ভিড় জমিয়েছেন সূর্যাস্ত দেখতে। আমরা গাড়ি থেকে নেমে দ্রুত পা চালালাম।
একটা পাথুরে মেঠো পথ ধরে উঠে এলাম একটু ওপর দিকে। জায়গাটা মূল রাস্তা থেকে কিছুটা উঁচুতে। সে গলিপথের শেষ প্রান্তে গিয়ে একটা বাঁক নিতেই সামনে উন্মুক্ত চত্বর। বিশাল বিশাল চ্যাপ্টা পাথরের সমারোহে জায়গাটা যেন এক প্রাকৃতিক উঠোন। এদিক ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছেন কয়েকজন পর্যটক। আমরা সে চত্বরে উঠে আসতেই আমাদের সকলের নজর গেল বাঁদিকের পাহাড়ের মাথায়। অন্তগামী সূর্য তার সমস্ত রঙ রূপ ডালি ভরে সাজিয়ে আজকের মত বিদায় জানাচ্ছেন। শ্যিলুয়েট আবছা কালো পাহাড়ের পিছনে ধীরে ধীরে নেমে যাচ্ছেন তিনি। পাহাড়ের নিচে কংসাবতীর ক্ষীণতনু শাখা নদীর রেখা সরু ফিতের মতো দেখাচ্ছে। বাঁদিকে, সামনে, পাখির চোখে নিচে দেখা যাচ্ছে জ্যামিতিক আকারের চাষের জমি, গ্রামের ঘরবাড়ি। আর ডানদিকে দেখা যাচ্ছে মুরুগুমা ড্যাম আর কালচে ছোট বড় পাহাড়ে ঘেরা ড্যামের জলরাশি। প্রায় সন্ধ্যা নামার মুখে, অস্তমিত সূর্যের শেষ আলোকছটার রংতুলিতে রাঙানো, পাহাড় ঘেরা মুরুগুমা ড্যাম ও পারিপার্শ্বিক দৃশ্যাবলীর সৌন্দর্য অবর্ণনীয়।
আরও অবর্ণনীয় সূর্যাস্তের দৃশ্য। সূর্য তখন দিনের ক্লান্তি গায়ে মেখে ধীরে ধীরে নেমে যাচ্ছে দিগন্তের বুকে।
আকাশ তখন নীরব জাগরণে একে একে উন্মোচন করছে তার রঙ বেরঙের গোপন উপাখ্যান। কমলা, লাল ও সোনা রঙের পরস্পর মিশ্রিত এক আভা যা অবধারিত ভাবে মনে করায় অগ্নিশিখাকে। শেষ আলোয় পাহাড়েরা হয়ে ওঠে ধোঁয়াটে নীল প্রতিমার মত। পাখিরা উড়ে যায় দলে দলে। তাদের প্রতিটি ডানার ঝাপটানিতে যেন সাঁঝের রঙ গভীর থেকে গভীরতর হয়। আর সূর্য ডুবে যেতে যেতে আকাশের কিনারায় রেখে যায় একটি দীর্ঘশ্বাস। সে দীর্ঘশ্বাস ধীরে ধীরে দিগন্ত থেকে পাহাড়ের পথ বেয়ে, বাতাসের ডানায় ভর করে চারিয়ে যায় আমাদের মধ্যে। ফিরতে হবে। সূর্য বিদায় জানিয়েছে আমাদের। রঙেরা বিদায় জানিয়েছে আমাদের। পাখিরা বিদায় জানিয়েছে আমাদের। পাহাড় বলছে ফিরে যাও। বিস্তীর্ণ জলরাশি বলছে সন্ধ্যা নেমেছে, ফিরে যাও। অতএব ফেরার পালা।
প্রকৃতির এক অপ্রাকৃত সৌন্দর্য দু’চোখ আর মন প্রাণ ভরে প্রত্যক্ষ করে একে একে সবাই নেমে এলাম রাস্তায়। উঠলাম গাড়িতে। গাড়ি চলল আমাদের রাতের আশ্রয়ের ঠিকানায়।
৫ই ডিসেম্বর, রাত সাড়ে এগারোটা।
তাঁবুতে শঙ্খ শোবার তোড়জোড় করছে। একটু আগেই রাতের আড্ডা সেরে ফেরা হয়েছে। শুতে যাবার আগে ঘটনাগুলো লিখে ফেলব বলে মনস্থির করেছি।
ডে আউট সেরে ফিরে এসে যার যেটুকু সময় লেগেছে ফ্রেশ হতে, সেটুকু সময়ই সবাই তাঁবুতে ছিল। তারপর সোজা ডাইনিং হলে। আমাদের যেটা আড্ডাখানা। মুড়ি, ভেজিটেবল পকোড়া আর চা আগেই থেকেই প্রস্তুত ছিল। আমরা যাওয়া মাত্রই সেগুলো আমাদের সামনে সাজিয়ে দিলেন রিসর্টের লোকজন। সাথে তাঁরা জানালেন, ড্রাই চিলি চিকেনও আসছে। শুনে, বিশ্বজিৎ খাটো স্বরে বিশ্বরূপকে বলল, ‘কি, বলেছিলাম না?’ শুনে বিশ্বরূপ চকচকে মুখে ঘাড় নাড়ল। কি যে বলেছিল বিশ্বজিৎ আর কেনই বা বিশ্বরূপ ঘাড় নড়ল সেটা অবিশ্যি আর শেষ পর্যন্ত জানা হয় নি।
আজ বিভাস আসছে। খবর এসেছে, বন্দে ভারত প্রাণপণে ছুটছে ওকে আমাদের কাছে জমা করবে বলে। ওকে আনতে যাবে আমাদের একটা গাড়ি। চালক সৌরভ। সাথে যাবে অপর চালক কালাদা। রাস্তায় যানজট হলে সৌরভ এই রাতের বেলা সানগ্লাস পরে রাস্তা ক্লিয়ার করতে নামবে কিনা, এই ভাবনার মাঝেই শুনলাম, আলোচনা চলছে বিভাস পুরুলিয়ার বদলে কোটশিলা নামলে অনেক সুবিধে। দূরত্ব কম হবে, সময় কম লাগবে।
বিভাসের সাথে আলোচনা করে চূড়ান্ত হল, ও কোটশিলা নামবে। গাড়ি কোটশিলা স্টেশনে যাবে। দুই সারথি গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। বিশ্বরূপ রিসর্টের একজনকে জিজ্ঞেস করল, ‘ভাই মাটন কদ্দুর?’
আজ ডিনারের মেনুতে পাঁঠার মাংস ছিল। সাথে ভাত, রুটি, বেগুন ভাজা, তরকারি আর শেষ পাতে মিষ্টি। এই মেনুটা ঠিক করার সময়ই সকলের জিভে জল চলে এসেছিল। বিশ্বরূপ তো অধৈর্য্যই হয়ে পড়ছিল। মাঝে মাঝে গোপনে কিচেনে গিয়েও উঁকিঝুঁকি দিচ্ছিল। টুপির ওপর থেকে টাক চুলকোতে চুলকোতে দ্রুতলয়ে পায়চারী করছিল। সেটা লক্ষ্য করে শান্তনু চিরাচরিত মোড়ল ঢংয়ে ঘোষণা করে দিল, ‘বিভাস এলে তারপরেই ডিনার হবে, তার আগে নয়।’
‘কিন্তু বিভাস তো রাতে কিছু খাবে না বলেছে, এসেই শুয়ে পড়বে।’ আমি বললাম।
মোড়ল আরও উচ্চগ্রামে জানাল,
‘সে আমি বুঝে নেব। বিভাস খাবে।’
বিশ্বরূপ ফোনে ধরল বিভাসকে। গলা খাটো করে জিজ্ঞেস করল, ‘ভাই কদ্দুর?’
রাত দশটা নাগাদ বিভাস ঢুকে পড়ল রিসর্টে। কোন ক্লান্তি নেই, গাড়ি থেকে নেমে হাঁক পাড়ল, ‘কোন টেন্টে আমার খাট দিয়েছে রে?’ গট গট করে সেই তাঁবুর দিকে এগোতে এগোতে, ‘কই রে তোরা সব!’ দ্বিতীয় হাঁকটা পাড়ল।
বিভসের হাতে ব্যাগপত্তর ছাড়াও একটি প্লাস্টিকের প্যাকেট ছিলো। সেটা নিয়ে বিশ্বজিৎ আর বিশ্বরূপ ফিসফিস করে কি যেন বলছে শুনে কান পাতলাম। বিশ্বজিৎ বলছে, ‘মিষ্টির কন্টেনার মনে হচ্ছে রে। কোলকেতা থেকে এনেছে।’
মিষ্টি! কি বলিস ভাই, তুই শিওর?’ বিশ্বরূপের উচ্ছ্বাস দেখে বিশ্বজিৎ বলে উঠল,
‘ আহ আসতে। চেঁচাস নি, মিষ্টিই এনেছে।’
‘কি মিষ্টি ভাই, বুঝলি কিছু?’
‘এখানে আলো একটু কম, তবু কালার দেখে মনে হচ্ছে গুলাবজামুন।’
‘গুলাবজামুন!! বলিস কি। তুই শিওর?’
‘আসতে আসতে। বললাম তো, কালার দেখে তাই মনে হচ্ছে।’
‘পাব তো ভাই?’ বিশ্বরূপের উদ্বিগ্ন গলা শুনে বিশ্বজিৎ সান্ত্বনা দিল,
‘পাবি, পাবি। আমাদের জন্যই তো এনেছে মনে হচ্ছে। কাঁদিস নি।’
খাব না, বেশ কয়েকবার বললেও, রাতে বিভাস খেল। শান্তনুর অনুরোধ নাকি পাঁঠার মাংস কোনটা ওকে থালা নিয়ে ডাইনিং টেবিলে বসিয়ে দিল তা ওই জানে। তবে রান্নার স্বাদ যে অসামান্য, সেটি বারেবারে ঘাড় নেড়ে জানাল। খেল না বিশ্বজিৎ। কারোর অনুরোধে এবং সুজয়ের ধমকেও ও টলল না। পৈটিক সমস্যার কারণে ও আজ না খেয়ে সারারাত তাঁবুতে পায়চারী করবে এমন আপ্তবাক্য শুনিয়ে, শুতে গেল।
খাওয়া দাওয়া শেষে তাঁবুতে ঢুকে বিশ্বরূপ দেখে নিল, টেবিলে বসানো আছে গুলাবজামুনের কৌটো। সব ঠিকঠাক আছে। খোলা হয় নি আজ। বিভাস ওর তাঁবুতেই থাকছে।
নিজের তাঁবুতে ফেরার পথে শান্তনু বলে গেল, ‘আজ গুলাবজামুনের কৌটো যেন খোলা না হয়, কাল দেখা যাবে।’ বিশ্বরূপ উদাস মুখে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে সম্মতিসূচক ঘাড় নাড়লেও মনে মনে যে মুখপোড়া, ওলাউটো বলে গাল পাড়ছিল না, তেমন কথা আমি হলফ করে বলতে পারি না।
৬ই ডিসেম্বর, সকাল আটটা।
ছ’টা নাগাদ ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হতে হতে শুনতে পাচ্ছিলাম বিভাসের গলা। সব তাঁবুর সামনে গিয়ে চিল্লিয়ে সবাইকে ওয়েক আপ কল দিচ্ছিল। কোন তাঁবু থেকে কোন সাড়া শব্দ না পেয়ে অবশেষে শান্ত হল। বোধহয় রণে ভঙ্গ দিয়ে গুটি গুটি ফিরে গেল নিজের আস্তানায়।
চায়ের কাপ হাতে তাঁবুর বাইরে এলাম। সকাল হয়েছে কিন্তু রোদ উঠতে আর একটু দেরি আছে। সামনে লনের ঘাসের ওপর দুটো ছাতারে পাখি খাবার খুঁজছে।
শীতের সকালের হিমেল হাওয়ায় প্রকৃতি যেন নিজেই নিঃশব্দে নিজেকে দেখছে। শ্বাস নিচ্ছে। আলো তখনও নরম, সূর্য লাজুক ভাবে আড়াল থেকে উঁকি দিচ্ছে। শিশিরে ভেজা ঘাসের ডগায় ডগায় মুক্তোর মতো ঝিলমিল করছে জলবিন্দু, প্রতিটি বিন্দুতে আটকে আছে রাতের শেষ স্বপ্ন।
গাছের পাতায় পাতায় শীতল স্পর্শ, সবুজ রঙ যেন আরও গভীর, আরও শান্ত। হাওয়ার মৃদু ছোঁয়ায় পাতারা ফিসফিস করে কথা বলে, আর সেই শব্দে মিশে থাকে দূরের পাখির প্রথম ডাক। চারপাশ জুড়ে আছে এক অপার্থিব প্রশান্তি, যেখানে সময় থেমে যায় মুহূর্তের জন্য, আর শীতের সকাল হৃদয়ে নেমে আসে এক স্নিগ্ধ, মায়াময় কবিতার মতো।
একে একে বন্ধুরা উঠে তাঁবুর বাইরে আসছে। কেউ কেউ ছবি তুলছে ইতিউতি। দু’একজন বাথরুমে। রিসর্টের কর্মচারীরা ব্রেকফাস্ট বানাতে ব্যস্ত। বেশ একটা সাজো সাজো পরিবেশ চারিদিকে। ব্রেকফাস্ট করে বেরোতে হবে দ্বিতীয় দিনের ভ্রমনসূচী সম্পন্ন করার লক্ষ্যে। উত্তমবাবুও এসে পড়বেন কিছুক্ষনের মধ্যেই।
৬ই ডিসেম্বর, সকাল এগারোটা।
গাড়ি ছুটছে পাকদণ্ডী পাহাড়ি পথ ধরে। মুরুগুমা ড্যাম পেরিয়ে পাহাড়ে উঠে পড়েছি কিছুক্ষণ আগে। অযোধ্যা রেঞ্জের এই পাহাড়গুলোর উচ্চতা খুব একটা বেশি না হলেও, ঘন জঙ্গলে আকীর্ণ। গাছপালা সেই শাল, পিয়াল, কেন্দু, মহুয়া, কুল, হরিতকি ইত্যাদি আর আছে অজস্র নাম না জানা গাছ আর ঝোপঝাড়। রাস্তা খুবই সরু। উলটোদিক থেকে গাড়ি এলে অসুবিধে হবে। তবে দুশ্চিন্তা করছি না কারণ পিছনে সৌরভের গাড়ি আছে। আর ওকে সকাল থেকেই সানগ্লাস পরে ঘুরঘুর করতে দেখেছি। কিছুক্ষণ পরেই এই রাস্তা পার করে ভাল রাস্তায় পড়ব ও তারপরের অযোধ্যা হিলটপের রাস্তা ভাল, তেমন অভয়বাণী শুনিয়ে রাখলেন গাইড উত্তমবাবু। আপাতত গাড়ির জানলা দিয়ে বনপথের সৌন্দর্য উপভোগ করায় মন দিলাম। ছোটনাগপুর মালভূমির এই অংশের বন্ধুর ভূপ্রকৃতি, পাহাড়, জঙ্গল, ছোট ছোট গ্রাম, গৃহপালিত পশু, শান্ত মানুষজনের কর্মব্যস্ততা, পাখির ডাক, সকালের রোদ, সব মিলিয়ে অপূর্ব এক দৃশ্যপট যে জাদুবাস্তবতার জন্ম দিয়েছে তা আমার ভাষাজ্ঞানের দৈনতা হেতু বর্ণনায় অক্ষম। এ শুধু চোখ চেয়ে দেখার। কান পেতে শোনার। মন দিয়ে হৃদয়ঙ্গম করার।
৬ই ডিসেম্বর, বিকেল সাড়ে তিনটে।
সদ্য লাঞ্চ সেরে আমরা মূল সড়কে দাঁড়িয়েছি এক খেজুর গুড় বিক্রেতার কাছে। উনি রাস্তার ধারেই একটি গুমটি বানিয়ে গুড় বিক্রি করছেন। একটি পেল্লায় চুল্লিতে একটি বিশাল বড় আয়তাকার কড়াইতে রস জ্বাল দেওয়া হচ্ছে। প্রয়োজন মত নলেন গুড় বা পাটালি গুড় বানিয়ে প্যাকিং করে বিক্রি করছেন বিক্রেতা। দরাদরি শুরু হল।
পাইস হোটেলে আজ লাঞ্চ সারা হয়েছে আমাদের। হোটেল টাটা। চড়িদা গ্রামে ঢোকার কিছু আগে মূল সড়কের ধারে। গরম ভাত, ডাল, ভাজাভুজি, তরকারি, মাছ, ডিম এসব দিয়ে দিব্যি উদরপূর্তি হয়েছে সবার। গোটা কয়েক দর্শনীয় স্থান ঘুরে, অনেকটা পথ উজিয়ে এসে সবার খিদেও পেয়েছিল জব্বর। বিশ্বরূপের মুখ শুকিয়ে আমসি হয়ে গেছিল। অবিশ্যি খিদে পাওয়া ছাড়াও তার পেছনে অন্য একটা কারণ ছিল। গুলাবজামুনের কৌটোটা নিয়ে ওঠা হয়েছিল গাড়িতে, রাস্তায় খাওয়া হবে বলে। ওটিকে নজরে রাখার জন্য ঠিক তার পাশের সিটটা বাগিয়েছিল ও। কোথাও ঝোপ বুঝে কোপ মারতে গিয়ে ছড়িয়ে একসা করে ফেলে। কন্টেনার উলটে গাড়ির সিটে, পা রাখার ম্যাটে রস ফেলে একাকার। কেলেংকারির একশেষ। সীতাকুণ্ডে আমরা যখন কুয়ো দেখছি, সৌরভ তখন ওর গাড়ি ধুচ্ছে।
সীতাকুণ্ড। অযোধ্যা পাহাড়ের হিলটপ পেরিয়ে গাড়ি বেশ কিছুটা সোজা রাস্তায় এসে ডানদিকে ঘুরল। ডানদিকে না ঘুরে বাঁয়ে ঘুরলে উশুলডুংরি যাওয়ার রাস্তা। আমাদের পরবর্তী গন্তব্য। আপাতত গাড়ি ডানপন্থী। সে রাস্তায় কিছুটা এগিয়ে এসে উত্তমবাবুর কথামত গাড়ি থামল একটা বড় মাঠের ধারে। পাশেই বাগান্ডি গ্রাম। মাঠে গাড়ি রেখে আমরা ওনার পিছু পিছু চললাম সীতাকুণ্ডের দিকে। মাঠের ঢাল ধরে কিছুটা নেমে এসে একটা অতি শীর্ণ নালার ডান পাশ বরাবর দু’পা হেঁটেই এই কুন্ড। এটি একটি শীতল জলের প্রস্রবণ। এর আগে কয়েকটি উষ্ণ প্রস্রবণ দেখার অভিজ্ঞতা থাকলেও শীতল জলের প্রস্রবণ এই প্রথম দেখলাম।
একটি কুয়োর মত, ফুট চারেক ব্যাসের গোলাকৃতি বাঁধানো পাড়। ঝুঁকে দেখা গেল তার হাত কয়েক নিচে টলটল করছে স্বচ্ছ জল। জলের কয়েক হাত নিচে সাদা বালির আস্তরণ। সেই আস্তরণ ভেদ করে দু’এক জায়গায় বুড়বুড়ি কাটছে নিচ থেকে উঠে আসা জল। জলের সাথে উঠে আসছে সাদা বালিও। খুবই ছোট একটি প্রস্রবণ। খুব সামান্য জায়গা থেকেই জল উঠছে। জায়গাটা বিশেষ আকর্ষণীয় না হলেও শান্তনুর থেকে এর একটা ব্যাখ্যা পাওয়া গেল। ওর পড়াশোনা ভূতত্ববিদ্যা নিয়ে। ওর থেকে জানতে পারলাম ছোটনাগপুর মালভূমির এই অংশে মূলত রয়েছে আগ্নেয় ও নানান রূপান্তরিত শিলা। মূল গঠন গ্রানাইট নিস দিয়ে। এছাড়াও ম্যাগমাটাইট, অ্যাম্ফিবোলাইট, স্যান্ডস্টোন, কোয়ার্টজ জাতীয় পাথরও রয়েছে। চুনাপাথর বা লাইমস্টোন অঞ্চল নয় এটি। পাথরের স্তরের নিচে গ্রাউন্ড ওয়াটার থাকা খুব স্বাভাবিক। শিলার রূপান্তর প্রক্রিয়া, গঠন ও অবস্থানগত কারণে ভূগর্ভস্থ জলের চাপের তারতম্য হয়। হয়ত ঊর্ধ্বমুখী উচ্চ চাপে জল পাথরের ফাঁকফোকর দিয়ে বাইরে বেরিয়ে এসে এই প্রস্রবণের জন্ম দিয়েছে। জলের সাথে সাদা বালির উঠে আসাটা বোধহয় উপরিতলে সাদা বালি রাখার কারণে। পাথরের স্তরের ভিতর থেকে জলের সাথে সাদা বালির উঠে আসাটা খুব একটা গ্রহণযোগ্য নয়। স্থানীয় ভাবে এই প্রস্রবণ নিয়ে, রাম সীতার একটি লোককথা প্রচলিত আছে। বিশদে সে ব্যাখ্যায় আর গেলাম না।
এর পরের গন্তব্য উশুলডুংরি। গাড়ি ছুটল সে পথে। সীতাকুণ্ড থেকে প্রায় আট দশ কিলোমিটার দূরে সেই প্রত্যন্ত জায়গাটি। সময় লাগবে আধঘণ্টা মত। কিছুক্ষণের মধ্যেই বড় রাস্তা ছেড়ে ঢুকে পড়লাম গ্রামের পথে। সেই পরিচিত দৃশ্য দু’পাশে। গাছপালার ফাঁকে ফাঁকে মাটির বাড়ি ঘরদোর। পরিচ্ছন্ন। বাইরের দেওয়ালে ফুল লতাপাতার রঙিন আলপনা। পরিশ্রমী মানুষগুলোর পোষা প্রাণীরা ঘুরে বেড়াচ্ছে গ্রাম জুড়ে। আটপৌরে যাপনের গ্রাম্য চলচ্ছবি দেখতে দেখতে একসময় এসে পৌঁছলাম গ্রামের বাইরে, একটা প্রায় সমতলে চত্বরে। সামনে সরু রাস্তা পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নেমে গেছে নিচের দিকে। বাঁপাশে খাদ আর ডানদিকে একটা ওয়াচ টাওয়ার। গাড়ি থামল আশ্চর্য এক নীরব সৌন্দর্যের পৃথিবীতে। উশুলডুংরি। এবার গাড়ি থেকে নেমে উঠতে হবে ওয়াচ টাওয়ারে। ওখান থেকে পাওয়া যাবে চতুর্দিকের পাহাড়ের ৩৬০ ডিগ্রী ভিউ।
ওয়াচ টাওয়ারের তৃতীয় ও চতুর্থ ধাপ থেকে সবচেয়ে সুন্দর ভিউ পাওয়া যায়। চারদিকে ছোট বড় টিলা, লাল মাটির পথ, শাল পলাশের বন আর দূরে দূরে আদিবাসী গ্রাম। এখান থেকে তাকালে দেখা যায় ঢেউ খেলানো পাহাড়ের সারি, সবুজের নানান বাহার, দূরের পাহাড়সারির ধোঁয়াটে ল্যান্ডস্কেপ, রহস্যময় জঙ্গল, গভীর খাদ, শুকনো নদীখাত, নাম না জানা পাখিদের আনাগোনা। বাতাসে ভেসে আসে জঙ্গলের গন্ধ। পর্যটনের দিক থেকে উশুলডুংরি এখনও তুলনামূলকভাবে অপরিচিত, আর সেটাই তার সবচেয়ে বড় সম্পদ। অনাঘ্রাতা এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের রূপ রস আমাদের মোহাবিষ্ট করে রেখেছিল। ছবি তোলা হল অনেক। দেখা শেষে টাওয়ারের সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসতে আসতে মনে হচ্ছিল, উশুলডুংরি শুধু একটা স্বল্প পরিচিত পর্যটনস্থল নয়, এ যেন এক নীরব কবিতা, যেখানে পাহাড় কথা বলে না কিন্তু তাকিয়ে থাকলে অনেক কিছু শোনা যায়।
টাওয়ার থেকে নেমে এলাম একে একে। গাড়িতে উঠে এবার ছুটব অযোধ্যা পাহাড়ের আর এক দ্রষ্টব্যের দিকে, মার্বেল লেক। সে পথে যাত্রা শুরু হল। দুটো গাড়ি ছুটল গ্রাম পেরিয়ে বড় রাস্তা হয়ে অযোধ্যা পাহাড়ের অপর দিকে। অযোধ্যা পাহাড় কোনো একটি উঁচু চূড়াওয়ালা পাহাড় নয়, বরং ঢেউ খেলানো আনেক টিলার সারি। সেই অযোধ্যা পাহাড় রেঞ্জের একটি পাহাড়ে এই মার্বেল লেক। গাড়ি এবার বেশ প্রশস্ত সড়ক ধরে চলেছে। বেগও দ্রুত হয়েছে। সৌরভ গাড়ি ছোটাচ্ছে ভাল রাস্তা পেয়ে। কালাদাও শঙ্খর মুখের দিকে তাকিয়ে, ওর মুখনিঃসৃত নির্দেশানুযায়ী এক্সেলারেটরে চাপ বাড়াচ্ছে, কমাচ্ছে। শঙ্খ ফোনে ব্যস্ত থাকলে অবধারিত গাড়ি উল্টোপাল্টা চলছে। কালাদা গাড়ি নিয়ে কুমিরডাঙ্গা খেলছে। আমরাও সে খেলা উপভোগ করতে করতে আধঘণ্টা বাদে দুস্তুবেড়া ও তাড়পানিয়া গ্রাম পেরিয়ে, এসে পৌঁছলাম আমাদের দ্রষ্টব্যের দোরগোড়ায়।
গাড়ি থেকে নেমে কাঁচা পাথুরে পথ ধরে মিনিট খানেকের হাঁটা। দু’পাশে সারিবদ্ধভাবে দোকানপাট। খাবারদাবার, ফলের রস, স্থানীয় হস্তশিল্প, মনিহারী জিনিসপত্রের দোকান। বেচাকেনা চলছে। দাম তুলনামূলক সস্তা। এই অস্থায়ী দোকানগুলোর ব্যবসাপত্র পুরোপুরি পর্যটক নির্ভর। পর্যটকদের কেনাকাটার ওপর নির্ভর করছে ওঁদের রুটিরুজি। ফেরার পথে নবারুণ, শুভাশিস, বিভাস কিছু জিনিস কেনে ওঁদের থেকে। স্থানীয় অর্থনীতিতে পর্যটকেরা অবদান রাখেন। আমরাও সাধ্যমত রেখেছিলাম।
হেঁটে উঠলাম একটা উঁচু সমতল জায়গায়। বেশ প্রশস্ত জায়গাটা। ওখান থেকে নিচে পাখির চোখে দেখলাম, পাহাড়ের গভীরে লুকিয়ে থাকা বিস্ময়কর সবুজ জলরাশি, মার্বেল লেক। এটি কোনো প্রাকৃতিক হ্রদ নয়। জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণের জন্য এবং বাঁধ বানানোর জন্য বিস্ফোরণ ঘটিয়ে, পাহাড় ফাটিয়ে পাথর উত্তোলনের ফলে সৃষ্টি হওয়া একটি বিশাল পরিত্যক্ত গহ্বর, যেখানে বৃষ্টির জল ও ভূগর্ভস্থ জল জমে তৈরি হয়েছে এই মনোমুগ্ধকর জলাশয়। মার্বেল লেক ছাড়াও এটি পাতাল লেক নামেও পরিচিত। এটি একটি বদ্ধ জলাশয়। এখান থেকে জল বেরোবার কোন রাস্তা নেই। বৃষ্টির জল এখানে জমে। ভূগর্ভস্থ জলও রয়েছে। চারপাশের পাহাড়ের ছায়া পড়ে জলে। মেঘের ছায়া পড়ে। নীল আকাশের প্রতিবিম্ব ফুটে ওঠে জলতলে। কখনো তাই জলের রঙ নীল, কখনো সবুজ, কখনো বা কালচে। এই লেকের চারপাশে খাড়া, কালচে, পাথুরে পাহাড়, মূলত আগ্নেয় শিলা, যেগুলো সাধারণত দিনের আলোয় রুক্ষ ও কঠিন মনে হলেও এখন এই শীতের নরম রোদের ছায়ায় কেমন যেন কোমল বলে মনে হচ্ছে। পাথরের স্তরগুলো খুব সুন্দর ভাবে দৃশ্যমান। রোদ্দুরের ছোঁয়ায় এখন লেকের জল গভীর সবুজ। প্রকৃতি, মানুষের ফেলে যাওয়া ক্ষতকে এমন সুন্দরভাবে গড়ে দিয়েছে যে, তা যেন আজ এক অনন্য শিল্পকর্ম হয়ে দাঁড়িযেছে।
সব পরিচিত জায়গা সুন্দর হয় না, সব সুন্দর জায়গা পরিচিত হয় না। কিছু সৌন্দর্য থাকে আড়ালে, শুধু যারা ধীরে হাঁটে, তারাই সেগুলো খুঁজে পায়।
সময় সীমিত। তাই আরও কিছুক্ষন হ্রদ দেখার বাসনা থাকলেও, তা আর হল না। ফেরার পথ ধরতে হল। বিশ্বরূপ আর বিশ্বজিৎ ফিসফিস করছে দেখে দৌড়লাম ওদের দিকে। কান পাতলেই মনি মুক্তো ঝরে। এবারও ঝরল।
‘কখন লাঞ্চ রে? সেই সত্য না ত্রেতা যুগে খেয়েছি।’
‘হবে হবে।’ বিশ্বজিৎ আশ্বস্ত করল।
‘গুলাবজামুনের কৌটোটাও বিট্রে করল। দুটো খেয়ে নিতে পারলে…।’
‘সরা কে ধরা জ্ঞান কচ্চিস। দুটো গুলাবজামুনে তোর কিছু হত?’
‘হত না, না রে? তালে চল। পরে হবে’খন।’
পার্কিং লটে ফেরার পথে স্থানীয় দোকান থেকে সুমিষ্ট আখের রস খেয়ে গাড়িতে ওঠা গেল। পরবর্তী গন্তব্য আপার ও লোয়ার ড্যাম।
গাড়ি ছুটল সাঁ সাঁ করে। রাস্তা ভালই। পাহাড়ি রাস্তায় চোখে পড়ল অনেক দামি রিসর্ট যেখানে বিলাসের সব উপকরণ পর্যটকদের জন্য সাজানো রয়েছে। ফেল কড়ি, মাখো তেল। কিছুদূর যাওয়ার পর দেখলাম, রাস্তা ক্রমশ অপ্রশস্ত হয়ে আসছে। দুপাশে লোহার রেলিং দেওয়া একটা কালভার্ট পেরিয়ে আমরা উঠলাম আপার ড্যামের ওপর। ড্যামের ওপর দিয়েই গাড়ি চলাচলের রাস্তা। রাস্তার বাঁদিকে বিস্তীর্ণ জলাশয়, বাঁধের কারণে যার সৃষ্টি। ডানদিকে পাহাড়ের ঢেউ খেলানো সারি। বাঁধের দু’পাশে দু’রকম ল্যান্ডস্কেপ।
অযোধ্যা পাহাড়ের উঁচু মালভূমিতে, স্থানীয় ঝোরা ও জলপ্রবাহে নির্মিত এটি একটি জল ধরে রাখার বাঁধ। স্টোরেজ ড্যাম। বর্ষায় ঝর্না ও অন্যান্য জল প্রবাহের অতিরিক্ত জল এখানে জমা হয়। পরে সেই জল ধাপে ধাপে লোয়ার ড্যাম ও সমতলে পাঠানো হয়। এটি ভারত-জাপান যৌথ উদ্যোগে, জাপানী কারিগরি সহায়তায় তৈরী। এ প্রসঙ্গে পরে আসছি। আপাতত সবাই ছবি তুলতে ব্যস্ত। শীতের রোদে তেমন তেজ নেই। নরম আলো। বাঁধের দু’পাশের দৃশ্যাবলীও খুব সুন্দর। সব মিলিয়ে ছবি তোলার আদর্শ পরিবেশ। জলাধারকে ব্যাকড্রপে রেখে সে সুযোগের সদ্ব্যবহার করা হল যথেচ্ছ। সবার মোবাইলের বেশ কিছু স্টোরেজ স্পেস ভর্তি হল।
এবার নিচে নামার পালা। নিচে আছে লোয়ার ড্যাম। আপার, লোয়ার দুটো ড্যামই একই প্রকল্পের অন্তর্গত। পাকদন্ডী পথ বেয়ে নিচে নামছে গাড়ি। কখনো বাঁয়ে পাহাড়, ডানে খাদ। কখনো ডানে পাহাড়, বাঁয়ে খাদ। নামতে নামতে মিনিট পনের কুড়ি বাদে এসে পৌঁছলাম এমন এক জায়গায় যেখান থেকে লোয়ার ড্যাম সবচেয়ে সুন্দর ভাবে দেখা যায়।
গাড়ি দাঁড়াল রাস্তার ধারে। নেমে আমরা একটু এগিয়ে গিয়ে প্রত্যক্ষ করলাম পাহাড়ের কোলে বাঁধ ও বিস্তীর্ণ জলাশয়। জায়গাটা নিরাপত্তার কারণে লোহার জাল দিয়ে ঘেরা। কারণ ওপাশে গভীর খাদ। সামনে তাকিয়ে মন ভরে গেল। আঁকাবাঁকা পথে পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে বিশাল জায়গা জুড়ে টলটল করছে, বাঁধের কারণে আটকে থাকা কালচে সবুজ জল। যখন ছাড়া পাবে তখন সে জল ছুটবে দ্রুতবেগে সমতলের দিকে। আপার ড্যামের ছাড়া জল সেকেন্ডারি স্টোরেজ হিসেবে ধরে রাখা হয় এখানে। বামনি ঝর্নার জলের প্রবাহও রুদ্ধ হয়েছে এই বাঁধে। দুই পাহাড়ের মাঝে বাঁধ দেওয়া হয়েছে। কংক্রিটের সেই বাঁধ, জল, পাহাড়-প্রকৃতির নকশা আর মানুষের কারিগরি মিলেমিশে চোখধাঁধানো এমন এক নিসর্গচিত্র তৈরি করেছে, যার কণা মাত্রই মোবাইলের ক্যামেরাতে ধরা গেল। বাকিটা রয়ে গেল আমাদের হৃদয়ে আর স্মৃতিতে।
আপার ড্যামের নিচের দিকে, তুলনামূলক কম উচ্চতায় অবস্থিত এই ড্যামটি আপার ড্যাম থেকে আসা জল নিয়ন্ত্রণ করার পাশপাশি সেচ ক্যানালে স্বাভাবিক প্রবাহ রাখতে সাহায্য করে। এই দুটি ড্যাম মূলত সেচব্যবস্থা উন্নয়ন, জলসংরক্ষণ ও বন্যা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
ভারত – জাপান যৌথ উদ্যোগে ও জাপানি কারিগরি সহায়তায় এই বাঁধদুটি নির্মিত হয়েছিল। অযোধ্যা পাহাড় অঞ্চলে পাথুরে, অসম ভূগঠন ও বর্ষায় প্রবল জলপ্রবাহের কারণে ড্যাম নির্মাণে উন্নত Geotechnical Engineering প্রয়োজন হওয়ায় জাপানি কারিগরি সহায়তা নেওয়া হয়েছিল। জাপানি প্রযুক্তি অনুসরণ করে নির্মিত এই বাঁধে অতিরিক্ত জলের চাপ না নিয়ে ধাপে ধাপে ছাড়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। স্পিলওয়ে ডিজাইনের এই বাঁধে যাতে ভূমিকম্প বা জলের চাপে ফাটল না ধরে সে ব্যবস্থা কার্যকর করা হয়েছে। খরাপ্রবণ রাঢ় অঞ্চলের কৃষিতে এই দুটি বাঁধের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। পুরুলিয়া, বাঁকুড়া ও পশ্চিম মেদিনীপুর অঞ্চলের হাজার হাজার হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা পাওয়া গেছে এর মাধ্যমে। এছাড়াও বাঁধ দুটি আজ পর্যটনের বড় আকর্ষণ। ফলে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থানও হয়েছে।
আমাদের যার যার গুড় নেবার ছিল, নেওয়া হয়ে গেছে। দাম সস্তার দিকেই। তবে গুনমান কেমন হবে জানি না। আশা করি ভালই হবে। দোকানিকে টাকা পয়সা চুকিয়ে গাড়ির দিকে এগোনো গেল। বিকেল পড়ে আসছে। সোনা গলা রোদের মিঠে তাপের নাগাল এড়িয়ে ঠান্ডা এসে ছুঁয়ে যাচ্ছে শরীর। এখান থেকে কিলোমিটার দেড়েক এগোলেই চড়িদা গ্রাম।
৬ই ডিসেম্বর, সন্ধ্যা সাতটা,
এইমাত্র এসে পৌঁছলাম রিসর্টের তাঁবুতে। গাইড বিদায় নিয়েছেন। সবাই যে যার তাঁবুতে ঢুকে গেছে ফ্রেশ হবার জন্য। একটু বাদেই সবাই আবার জমায়েত হবে ডাইনিং হলে। সেখানে কিছু স্ন্যাক্সের ব্যবস্থা আছে। তবে আজ সন্ধ্যের মূল আকর্ষণ কিন্তু অন্য। আজ সামনের খোলা মাঠে বারবিকিউয়ের ব্যবস্থা হয়েছে। সাথে মাইক্রোফোন, বক্স, কারাওকে এসবেরও ব্যবস্থা করা হয়েছে। ঝলসানো মুরগির সাথে কিঞ্চিৎ গান বাজনা-আমোদের ষোলোকলা আজ পূর্ণ হবে। বিশ্বরূপের মুডের লেভেলই এখন আলাদা। তাঁবুতে ঢোকার আগেই বিশ্বজিৎ ওর কানে কানে বলে দিয়েছে,
‘আজ রাতের ডেসার্ট, গুলাবজামুন।’
কে যেন তাঁবুর বাইরে চিল্লোতে চিল্লোতে হাঁটছে। দরজা থেকে মুখ বাড়িয়ে দেখি বিভাস। পায়চারী করছে আর আপনমনে বলে যাচ্ছে, ‘কোন আপদ যে এই শীতে তাঁবুতে থাকার কথা ভেবেছে, কে জানে। এই ঠাণ্ডায় তাঁবুতে থাকা আর খোলা মাঠে শোয়া একই ব্যাপার।’
আজকের ভ্রমণ শেষ হয়েছে চড়িদা গ্রাম আর খয়েরাবেড়া ড্যামে সূর্যাস্ত দেখে। বিকেলে ঢুকেছিলাম চড়িদায়। গ্রামের ভিতরে ঢোকা হয়নি। মূল সড়কের দু’পাশে সারি সারি দোকান যেখানে মুখোশ সাজানো আছে থরে থরে। দেখা যায়। কেনা যায়। ওখানেই অনেক শিল্পী মুখোশ বানান, আঁকেন। সামনে দাঁড়িয়ে দেখা যায়।
চড়িদা, বাঘমুণ্ডি ব্লকে অবস্থিত একটি স্বল্প জনবহুল গ্রাম, যা ছৌ মুখোশ শিল্প ও ঐতিহ্যবাহী ছৌ নাচের জন্য সারা দেশে এমনকি বিদেশেও পরিচিত। চড়িদা, মুখোশ গ্রাম নামেও খ্যাত কারণ এই গ্রামেই ছৌ নৃত্যের জন্য ব্যবহৃত মুখোশ তৈরি হয় এবং প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই এই শিল্পকর্ম হয়ে থাকে। গ্রামের বেশিরভাগ মুখোশ শিল্পী সূত্রধর সম্প্রদায়ের লোক। এই শিল্প, গ্রামের পরিবারগুলিতে বহু প্রজন্ম ধরে হস্তান্তরিত হয়ে আসছে। মুখোশ তৈরি বেশ জটিল ও ধৈর্যশীল একটি প্রক্রিয়া। মাটি বা জিপসামের ছাঁচে পেপার পাল্প আর আঠা মিশিয়ে ঢালা হয়। একাধিক পেপার পাল্পের স্তর রাখা হয় মুখোশের বেধ অনুযায়ী। নিখুঁত অবয়বের জন্য মাটি ব্যবহার করা হয়। তারপর শুকিয়ে, পালিশ করে, রঙ এবং নানান সাজসজ্জা দিয়ে মুখোশ সাজানো হয়।
ছৌ মুখোশ শিল্পের সূত্রপাত প্রায় ১৫০ বছর আগে। বাঘমুণ্ডির রাজা মদন মোহন সিংহ দেবের প্রচেষ্টায় চড়িদাতে এই শিল্পকর্মের পত্তন হয়। প্রাচীনকাল থেকে মুখোশ মূলত ছৌ নৃত্যের প্রয়োজনে তৈরি হলেও বর্তমানে এগুলি গৃহসজ্জা, স্মারক ও হস্তশিল্প হিসেবেও জনপ্রিয়। ছৌ পূর্ব ভারতের একটি ঐতিহ্যবাহী নাচ যা একাধারে নাচ, মার্শাল আর্ট ও লোকসংস্কৃতির সমন্বয়ে গঠিত। এটি পুরুলিয়া, ঝাড়খন্ড ও ওড়িশার কিছু অঞ্চলে লোকসংস্কৃতির অঙ্গ হিসেবে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে বিদ্যমান। এই নাচে মহাভারত, রামায়ন, পুরাণ ও লোককথা থেকে নেওয়া গল্পগুলো, দেবদেবী, দানব, অসুর ইত্যাদি নানান বর্ণময় চরিত্র চিত্রণের মাধ্যমে চমৎকার ভাবে উপস্থাপন করা হয়। ২০১০ সালে, ছৌ নাচকে ইউনেস্কো অপরিহার্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য (Intangible Cultural Heritage) হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
পুরুলিয়ার চড়িদা গ্রাম শুধুমাত্র একটি জেলার সাধারণ গ্রাম নয়। এটি একটি সৃজনের ও শিল্প সন্ধানের প্রতীক, যেখানে শতাব্দী পার করে মুখোশ শিল্প ও ছৌ নৃত্যের লৌকিক ঐতিহ্য সংরক্ষিত হয়ে এসেছে।
আমাদের যা কেনাকাটা করার ছিল, তা সাঙ্গ হয়েছে। সূর্য পাটে যেতে বসেছে। বিকেলের রোদ ঢলে এসেছে। খয়েরাবেড়া ড্যামে সূর্যাস্ত দেখতে হলে এখনি ছুটতে হবে। দেরি করা যাবে না। উঠে বসা হল গাড়িতে। কালাদা আর সৌরভ গাড়ি ছোটাল সেদিক পানে।
সোজা রাস্তা ধরে মিনিট পনের গাড়ি চলার পর ডানহাতি অপ্রশস্ত একটি রাস্তায় ঢুকলাম আমরা। কিছুটা এগোনোর পর শর্টকাটে দ্রুত পৌঁছোবার তাগিদে সে রাস্তা ছেড়ে ঢুকে পড়া গেল গ্রামের ভিতরের রাস্তায়। আবার সেই পরিচিত গ্রামজীবনের চমৎকার দৃশ্যপট দু’পাশে। সাঁঝ ঘনিয়ে আসার মুখে সেই সহজ দৃশ্যের মায়া বাস্তবতা পেরোতে পেরোতে শেষ পর্যন্ত পেরিয়ে গেলাম এ রাস্তার শেষ গ্রাম, বুকাডি। রাস্তার শেষ ডানহাতি বাঁকটুকু পেরিয়েই উঠে পড়া গেল বাঁধের ওপর। সোজা রাস্তা চলে গেছে বাঁধের ওপর দিয়ে। আমরা সে রাস্তার মুখেই নেমে গেলাম গাড়ি থেকে। গাড়ি চলে যাবে নিচের পার্কিংয়ে। আমরা হাঁটা লাগালাম বাঁধের রাস্তা বরাবর।
বাঘমুন্ডিতে পাহাড় আর জঙ্গলের মধ্যে এই খয়েরাবেড়া বাঁধটি মূলত একটি সেচ বাঁধ। চেমটা পাহাড়, বাররা পাহাড়ের পাদদেশে বিস্তীর্ণ জলাশয় এখন আমাদের বাঁদিকে। মাছকান্দা ঝর্নার জলও এসে বাঁধা পড়েছে এইখানে। ডানদিকে বাঁধের জলপ্রবাহ পথ ছাড়াও দূরের ছোট ছোট গ্রাম, পাহাড়, বন জঙ্গল দৃশ্যমান। তার ওপরে, আকাশে, ছেঁড়া ছেঁড়া পেঁজা তুলোর মত মেঘের ভেলার মধ্যে দিয়ে পথ করে নিযে অস্তাচলে যেতে বসেছেন সুয্যিমামা। মৃদু রক্তিম আভা ছড়িয়ে আছে আকাশ জুড়ে। দিনের শেষ প্রহর যেন এক নীরব মন্ত্রমুগ্ধতার আস্তানা। এই সময় এখানে দাঁড়িয়ে মনে হল, প্রকৃতি নিজেই যেন রঙ তুলি নিয়ে আপন হাতে আঁকছে এক অনির্বচনীয় ক্যানভাস।
বিস্তীর্ণ জলাশয়টি তখন আর শুধু জল নয়, সে হয়ে উঠেছে আকাশের আয়না। শান্ত জলের বুকে ভেসে আছে লালচে প্রতিচ্ছবি, যেন আকাশ নিজের সমস্ত গোপন অনুভূতি ঢেলে দিয়েছে জলে। চারদিকে সবুজ বনে ঢাকা পাহাড়গুলো নীরব প্রহরীর মতো দাঁড়িয়ে। তাদের ছায়া ধীরে ধীরে লম্বা হয়ে জল ছুঁয়ে যায়। পাহাড়ের গায়ে জমে থাকা সব সবুজেরা যেন শীতল হাওয়ায় ভর করে ফিসফিস করে আমাদের কানে বলে যায় কোথাও কখনো না লেখা কবিতাগুলো।
খয়েরাবেড়া ড্যাম | জলাধারের উল্টোদিকে | পশ্চিম দিগন্তে রংমশাল | আকাশে জেটের কাটাকুটি
দিনের সমস্ত ক্লান্তি বুকে নিয়ে সূর্য নীরবে বিদায় নিল। তার আলো ক্রমশ ম্লান হয়ে এল, কিন্তু রেখে গেল এক গভীর প্রশান্তি, যা চোখে নয়, অনুভবে ধরা দেয়। শীতল হাওয়া এসে আলতো করে ছুঁয়ে যায় আমাদের শরীর আর মন। সেই হাওয়ার মধ্যে থাকে জল আর বনজ মাটির মিশ্র গন্ধ, যা শহরের কোলাহলে হারিয়ে যাওয়া আমাদের বলে, আবার শিকড়ে ফিরতে। দূরে কোথাও পাখির ডানার শব্দ, জল ছুঁয়ে যাওয়া হালকা ঢেউয়ের কলকল, সব মিলিয়ে পরিবেশটা তখন গভীরভাবে মনোরম ও অন্তর্মুখী।
ফেরার পালা এবার। অন্ধকার নামছে। শীতের দাঁত কামড় বসাতে শুরু করেছে। এখান থেকে রিসর্টে ফিরতে একঘণ্টার বেশি সময় লাগবে। উত্তমবাবু জানালেন, যে পথে এসেছি, সে পথে ফিরলে অনেক বেশি সময় লাগবে। গাড়ি চলবে অনেক বেশি। উনি অন্য পথে নিয়ে যাবেন। কাছেই একটি পাহাড় পেরিয়ে খামার রোড। তারপর মামুডি হয়ে মুরুগুমা নেমে যাব। সে রাস্তায় অনেক চড়াই উৎরাই, বন জঙ্গল, গ্রাম পড়বে। কিন্তু আমরা সে দৃশ্য উপভোগ করতে পারব কিনা জানিনা। কারণ প্রায় অন্ধকার নেমে এসেছে।
দুটো গাড়ি ড্যামের পথ ছেড়ে, উত্তমবাবু নির্দেশিত, বাঁহাতি একটি পাহাড়ি পথ ধরল। চড়াই পথে উঠতে উঠতে দেখা মিলল হাট ফেরতা নরনারীর। হাতে, মাথায় ব্যাগ, বোঝা। সন্ধ্যার আবছা আলো মুছে যেতে যেতে পাহাড়ি পথ ধীরে ধীরে অন্ধকারের চাদরে ঢেকে নিচ্ছিল নিজেকে। সেই পথে তখন হাট ফেরত মানুষেরা ফিরছে, দিনের শেষ ব্যস্ততাটুকু বুকে বেঁধে। কারও কাঁধে ঝুলছে বস্তা, কারও হাতে বাজারের থলি, কারও আবার মাথার বোঝা থেকে ঝরে পড়ছে দিনের ক্লান্তির শেষ নির্যাসটুকু।
পাহাড়ের আঁকাবাঁকা পথে তাদের পায়ের শব্দ ছন্দ যেন এক আচেনা গানের সুর। অন্ধকার ঘনালেও সেই পথ যেন ভয়ের নয়, বরং পরিচিত, আপন, যেখানে প্রতিটি বাঁক জানে এই মানুষগুলোর গল্প।
দূরের গ্রাম থেকে ভেসে আসে ক্ষীণ আলো, আর পাহাড়ের গায়ে গায়ে ছায়ার মতো এগিয়ে চলে হাট ফেরত জীবনের সারি। সন্ধ্যার এই ক্ষণে পাহাড় শুধু প্রকৃতি নয়, সে সাক্ষী হয়ে দাঁড়ায় মানুষের পরিশ্রম, স্বপ্ন আর সংসারের নীরব লেনদেনের। ক্রমশ ঘনিয়ে আসা অন্ধকারের মধ্যেও এই দৃশ্য হয়ে ওঠে উষ্ণ, মানবিক এক চলচ্চিত্র।
ঘরে ফেরার পালা | পথের ক্লান্তি ভুলে | গাছেদের ফিসফিস বাতাস বয়ে আনে
ধীরে ধীরে আঁধার ঘনিয়ে এল। রাস্তার দুপাশের পাহাড় হয়ে উঠল আরও রহস্যময়। সূর্যাস্তের শেষ রক্তিম আভা পাহাড়ের কাঁধ ছুঁয়ে মিলিয়ে যায়, আর চারপাশে নেমে আসে গম্ভীর অন্ধকার। পাহাড়ের গায়ে গায়ে দাঁড়িয়ে থাকা বৃক্ষগুলো তখন ছায়ামূর্তিতে রূপ নেয়, প্রাচীন কোনো গল্পের নীরব শ্রোতা হয়ে।
পথের বাঁকগুলো অচেনা হয়ে ওঠে, তবু ভয় নয় বরং এক গভীর মুগ্ধতা জন্ম নেয়। দূরে ঝিঁঝি পোকার ডাক আর বাতাসে পাতার শব্দ মিলেমিশে সৃষ্টি হয় প্রকৃতির নিজস্ব অর্কেস্ট্রা। আকাশে একে একে জ্বলে ওঠে তারারা, যেন পাহাড়ের শীর্ষে ঝুলে থাকা ক্ষুদ্র প্রদীপ, পথিককে নীরবে আশ্বাস দেয়।
সেই আশ্বাস আর গাড়ির হেডলাইটের আলোকে সম্বল করে পেরোতে লাগলাম সেই মায়াবী পথ। কত গ্রাম ফেলে এলাম পিছনে। পেরোলাম কত চড়াই উৎরাই। নাম না জানা কত গাছ রয়ে গেল অজানাই। না চেনা পাহাড়ি ঝোরা আর নালাগুলো রয়ে গেল অচেনাই। একসময় আমরা এসে উঠলাম খামার রোডে। এবার মোটামুটি চেনা রাস্তা। এ পথে কিছুক্ষণ এগোলেই মামুডি। সেখান থেকে ডানহাতি রাস্তা নেমে গেছে মুরুগুমা।
সাতটা নাগাদ আমরা এসে পৌঁছলাম রিসর্টে। উত্তমবাবু আমাদের বিদায় জানিয়ে তাঁর মোটর সাইকেলটি নিয়ে বাড়ির পথ ধরলেন। আমরাও ক্লান্ত শরীর নিয়ে এগোলাম তাঁবুর দিকে। বিশ্বরূপ নবারুণের পিছন পিছন হাঁটছিল। নবারুণের হাতে ঝুলছিল গুলাবজামুনের কৌটো।
৬ই ডিসেম্বর, রাত সাড়ে বারোটা,
আগামীকাল ফেরা। শুরুর মত সবকিছুরই একটা শেষ থাকে। আমাদের পুরুলিয়া ভ্রমণ এবারের মত শেষ হল। তবে শেষটুকু বেশ মনে রাখার মত হল। আজকের সন্ধ্যেটা দুর্দান্ত কাটল। বারবিকিউ আর গান বাজনা নিয়ে ভরপুর আমোদ হল সবার।
পরিকল্পনাটা শান্তনুর। সেই অনুযায়ী মাইক্রোফোন, বক্স ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক জিনিষপত্র যোগাড় করে আনলেন রিসর্টের ম্যানেজার দমনবাবু। অল্প স্ন্যাক্স খেয়েই সবাই মেতে উঠল আসর জমাতে। ওদিকে লনের একপাশে লক্ষক্ষ্মণবাবু ম্যারিনেট করা চিকেন শিকে গেঁথে, কাঠ কয়লার আগুন জ্বালাতে ব্যস্ত। বিশ্বরূপ দু’একবার খোঁজ করে গেছে, চিকেন কাবাবের হাল হকিকত নিয়ে।
হৈ হুল্লোড়, গান বাজনা, এর তার পিছনে লাগা, কাঠ কয়লার ধোঁয়া, মাংস পোড়া গন্ধ, রাতের ঠান্ডা সব মিলিয়ে বেশ একটা কার্নিভাল মার্কা আবহ। এরই মধ্যে মাইক্রোফোনে শান্তনুর সঞ্চালনা শুরু হয়ে গেল। গান গাইল শান্তনু, শঙ্খ আর নবারুণ। অচর্চিত হলেও সবারই গলা বেশ খোলতাই এবং পরিবেশের সঙ্গে দিব্যি মানানসই। হিন্দি বাংলা মিলিয়ে বেশ কয়েকটা গান গাইল ওরা। হাতে হাতে ঘুরছে চিকেন কাবাবের প্লেট। লক্ষক্ষ্মণবাবু একের পর এক কাবাব জুগিয়ে চলেছেন। বেড়ে খেতে হয়েছে কাবাবটি। বিশ্বরূপ ডাইনিং হলে নাচতে নাচতে খাচ্ছে, খেতে খেতে নাচছে। পাশে প্লেট হাতে বিশ্বজিৎ। খাচ্ছে কিন্তু নাচছে না। দ্রুত দৌড়োদৌড়ি করে বিশ্বরূপের সাথে তাল মেলাচ্ছে যাতে কথোপকথনটা চালু থাকে। মনিমুক্তোর আশায় গেলাম সেথায়।
‘এত কাবাব খাস নি। রাতে ডিনার আছে।’
‘ডিনারে তো ফুলকপি। ধুস।’
‘খাবি না?’ সিলেবাসের বাইরে যাচ্ছে দেখে বিশ্বজিৎ উদ্বিগ্ন।
‘ও অল্পস্বল্প কিছু, খান ছয়েক রুটি, ব্যাস, আর কিছু লাগবে না।’
‘গুলাবজামুন? সেটার কি হবে?’
‘সারাদিন কৌটো খুলল না, এখন আর দরকার নেই।’
‘সেকি! খাবি না?’
‘প্রথমে একটু খেল দেখাব, তাপ্পর খাব।’
বুঝলাম সন্ধ্যের কার্নিভালের পর রাতে একটি খানদানি ড্রামা অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য।
সন্ধ্যের আমোদ প্রমোদ সাঙ্গ হবার পর সবাই অল্পবিস্তর ভাত, রুটি, বেগুনভাজা, ফুলকপির তরকারি দিয়ে ডিনার সারল। শেষ পাতে পড়ল গুলাবজামুন।
বিশ্বরূপ হাত নেড়ে জানাল, ওটি তার প্রয়োজন নেই। খাবে না। সকলেই তাকে সাধল। কিন্তু সে নিজ সিদ্ধান্তে অনড়। গুলাবজামুন সে খাবে না। সুজয়ের অনেক অনুরোধে নিমরাজি হয়ে বিরক্তির সুরে জানাল, ‘রেখে দে আমারটা, কাল সকালে দেখছি।’
আমাদের তাঁবুতে রাতের দিকে আড্ডা দিতে এল, শান্তনু, সুজয় আর বিভাস। জমাটি আড্ডার মাঝে শান্তনু
টেবিলের দিকে আঙ্গুল তুলে বলল, ‘ওটা কি রে?’
‘গুলাবজামুন। বিশ্বরূপের। শঙ্খ জানাল।
‘নিয়ে আয়। খাই।’ শান্তনুর কথায় সুজয় জানাল,
‘আরে কাল বিশ্বরূপ খাবে ওটা।’
‘ও খাবে না বলেছে। খাবার হলে রাতেই খেয়ে নিত। সকালে ফকালে ও খাবে ভেবেছিস? বাদ দে, খেয়ে নিই চল।’ সকলের আপত্তি উড়িয়ে দিয়ে ও উঠে টেবিল থেকে গুলাবজামুন নিল। নিজে খেল। সবাইকে সাধল। শঙ্খকে একরকম জোর করে করে খাওয়াল। খালি কৌটোটা ঠকাস করে টেবিলে রেখে হাত মুখ মুছে তাঁবুর দরজার
দিকে তাকিয়ে, পর্দা নড়ছে দেখে চেঁচিয়ে উঠল,
‘বাইরে কে? ভিতরে আয়।’
বিশ্বরূপ ঢুকল।
তারপর কি হইল জানে শ্যামলাল বলে দায় সারব না। তারপর যা হইল তা আমরাও জানি। জীবনের দুটো দিকই একসাথে চোখের সামনে ফুটে উঠল। একদিকে সাদা একদিকে কালা। বিশ্বরূপ করুণ চোখে বাকরুদ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে গুলাবজামুনের খালি কৌটোর দিকে। সে চোখে দৃষ্টি নেই, আছে শুন্যতা, আছে হাহাকার, আছে বেদনা। হৃদয়বিদারক সে দৃশ্য সহ্য করা মুশকিল, দু’চোখে জল চলে আসে। ওদিকে তাঁবু কাঁপিয়ে অট্টহাস্য।
আমার, শান্তনুর আর সুজয়ের। হাসির সাথে দুয়ো।
‘কি রে গুলাবজামুন খেতে এলি!’
তাঁবুর ভিতরে দুই রসের ফল্গুধারা বইছে। একদিকে করুণ রসের অপর দিকে হাস্যরসের। দুই রসের মাঝে পড়ে বিব্রতকর অবস্থা শঙ্খর। অপরাধবোধে ভুগছে। শেষ গুলাবজামুনের শেষ কামড়টা ওরই ছিল। বিভাস আপত্তি করছে, আমাদের ক্ষান্ত হতে বলছে। আমাদের উচ্চগ্রামের হাসি ঠাট্টার মধ্যেই লক্ষ্য করলাম বিশ্বরূপ বিড়বিড় করছে। কানটা কাছে নিয়ে গিয়ে শুনলাম ও বলছে,
‘আমি গুলাবজামুন খেতে আসি নি। আমি শঙ্খর সাথে ঠাকুর নিয়ে আলোচনা করতে এসেছি।’
এরপরের অট্টহাস্যের সেশনে শঙ্খ আর বিভাসও যোগ দিয়েছিল।
৭ই ডিসেম্বর, সকাল এগারোটা,
গাড়ি চলেছে কলকাতার দিকে। সাড়ে দশটা নাগাদ গাড়ি ছেড়েছে রিসর্ট থেকে। এতদিন যে ল্যান্ডস্কেপ মোহিত করে রেখেছিল আমাদের, তা ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে পিছনপানে। ফিরে যাচ্ছি স্মৃতি নিয়ে আর আবার ফিরে আসার তীব্র আকাঙ্খা নিয়ে।
সকালে সবাইকে বেশ তাড়া লাগাতে হয়েছিল রেডি হবার জন্য। তাড়াহুড়োয় বিশ্বরূপ টুপি পড়েই স্নান সেরে নিয়েছে। গতরাতের ঘটনায় ওর সারা রাত ঘুম হয় নি। তাঁবুর ভিতরে আড়াই ফুট জায়গায় সারা রাত পায়চারী করেছে বলল। ভোরের দিকে হাল্কা থকে মাঝারি ধরণের অম্বলও নাকি টের পেয়েছে। তাই সকালে জলখাবার খাবে না ঘোষণা করল। বিশ্বজিৎ যথারীতি ওর সাথে সেঁটে ছিল। মান ভাঙ্গাবার চেষ্টা চেষ্টা করছিল। বোঝাচ্ছিল। বন্ধুরা তো এরকমই হয়, এতে মাইন্ড করতে নেই, এরকম বাণী দিচ্ছিল। বিশ্বরূপের চোখ ছলছল করছিল কিন্তু জল গড়াচ্ছিল না। তাই ওর চোখ মুছে দেবার সুযোগটা পায় নি বিশ্বজিৎ যদিও হাতে টিস্যু নিয়ে প্রস্তুত ছিল। কিন্তু বিশ্বরূপ অনড়। সে খাবে না। সে ছলছলে চোখ নিয়ে বসে অন্যদের খাওয়া দেখবে। এমনটাই বারবার জানাচ্ছিল
বিশ্বজিৎকে।
বলতে বলতে জলখাবার চলে এল। কর্মীরা টেবিলে প্লেট সাজাতে শুরু করল। বিশ্বরূপ লাফিয়ে উঠে টেবিলের কোণের দিকে একটা চেয়ার বাগিয়ে, হাঁক পাড়ল,
‘আজ কি বানিয়েছ? জলদি লাও।’
৭ই ডিসেম্বর, সন্ধ্যা সাতটা,
গাড়ি শক্তিগড় ছাড়ল। এখানে থামা হয়েছিল রিফ্রেশমেন্টের জন্য। আর কোথাও থামবে না গাড়ি। এরপর সোজা যে যার বাড়ি। শক্তিগড়ে সবাই কিছু না কিছু খেল বা বাড়ির জন্য কিনল। ল্যাংচা দেখিয়ে শান্তনু বিশ্বরূপকে গুলাবজামুন এরকম লম্বা হয়ে গেল কেন জানতে চাইলে, বিশ্বরূপ দার্শনিকের ভঙ্গীতে শান্তনুকে একটা কৃপাদৃষ্টি দিল। সাথে আলগা একটা হাসি।
গাড়িতে বিশ্বরূপ আবার বিড়বিড় করছে দেখে অবাক হলাম। এই তো খেয়ে উঠল, এক্ষুণি আবার খিদে পেয়ে গেল! আজব ব্যাপার! কান পেতে বুঝলাম ও হরি, ইনি তো গান ধরেছেন। কি গান শোনার জন্য কানটা আরও কাছে নিয়ে গেলাম। শুনে মন ভরে গেল। ও গাইছে,
‘ইয়ে দোস্তি হাম নেহি তোড়েঙ্গে।’
বাহ এই তো স্পিরিট। এই তো বন্ধুত্ব। এই তো চাই। এটাই তো শেষ কথা! সাবাস!
কিন্তু পরের লাইনটা শুনে স্তম্ভিত হয়ে গেলাম।
‘নেক্সট ট্রিপে গুলাবজামুন হাম নেহি ছোড়েঙ্গে।’
সমাপ্ত